Homeব্লগINDIA-RUSSIA Friendship: মহাকাশ থেকে ভারতের ৮০তম স্বাধীনতা দিবসে বিশেষ শুভেচ্ছা, আন্তর্জাতিক মহাকাশ...

INDIA-RUSSIA Friendship: মহাকাশ থেকে ভারতের ৮০তম স্বাধীনতা দিবসে বিশেষ শুভেচ্ছা, আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে উড়ল ভারতীয় তেরঙ্গা, পুনর্ব্যক্ত ভারত-রুশ সুদৃঢ় বন্ধুত্ব!!!

মহাকাশ থেকে ভারতের ৮০তম স্বাধীনতা দিবসে বিশেষ শুভেচ্ছা: আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে উড়ল ভারতীয় তেরঙ্গা, পুনর্ব্যক্ত ভারত-রুশ সুদৃঢ় বন্ধুত্ব

ভারতের ৮০তম স্বাধীনতা দিবসের ঐতিহাসিক মাহেন্দ্রক্ষণে বিশ্ববাসীকে এক অভূতপূর্ব ও রোমাঞ্চকর দৃশ্যের সাক্ষী করল আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশন (আইএসএস)। পৃথিবী থেকে শত শত কিলোমিটার উঁচুতে মহাশূন্যে ভাসমান গবেষণাগারে রাশিয়ার কসমোনটরা হাতে ভারতের জাতীয় পতাকা তেরঙ্গা তুলে ধরে কোটি কোটি ভারতবাসীকে আন্তরিক অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। ভারত ও রাশিয়ার মধ্যকার কয়েক দশকের সুদৃঢ় ও সময়-পরীক্ষিত কৌশলগত এবং বৈজ্ঞানিক অংশীদারিত্বের কথা স্মরণ করে তাঁরা স্পষ্ট ভাষায় উল্লেখ করেন, দুই দেশের পারস্পরিক সম্পর্কের অন্যতম শক্তিশালী ও মূল ভিত্তি হলো এই যৌথ মহাকাশ গবেষণা।
এক বিশেষ ভিডিও বার্তায় রুশ মহাকাশচারীরা ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস, আত্মনির্ভরতার পথে ভারতের অভাবনীয় অগ্রগতি এবং মহাকাশ বিজ্ঞানে উভয় দেশের অবিচ্ছেদ্য সম্পর্কের চিত্র তুলে ধরেন। মহাকাশ স্টেশন থেকে প্রেরিত এই ভাবগম্ভীর অথচ উষ্ণ বার্তা ভারতের স্বাধীনতা বার্ষিকীর প্রাক্কালে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক ও বৈজ্ঞানিক হালচালে এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে।

মহাকাশ স্টেশন থেকে বিশেষ ভিডিও বার্তা: কী বললেন কসমোনট পিওত্র দুব্রোভ?

আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে অবস্থানরত অভিজ্ঞ রুশ কসমোনট পিওত্র দুব্রোভ (Pyotr Dubrov) ভিডিও বার্তার সূচনায় ভারতের জনগণকে উদ্দেস করে বলেন:
“প্রিয় বন্ধুরা, আজ ভারতের প্রজাতন্ত্র তার ৮০তম স্বাধীনতা দিবস উদযাপন করছে। আট দশক আগে ভারত ঔপনিবেশিক শাসনের শৃঙ্খল মুক্ত হয়ে আত্মনির্ভরতা ও সমৃদ্ধির এক নতুন যাত্রাপথ শুরু করেছিল।”
পিওত্র দুব্রোভ ভারতের জনগণ, সরকার এবং বৈজ্ঞানিক সম্প্রদায়কে শান্তি, প্রগতি ও অব্যাহত সমৃদ্ধির জন্য শুভেচ্ছা জানান। তিনি আরও বলেন, ভারত ও রাশিয়ার মধ্যে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের নানা দিক থাকলেও মহাকাশ অনুসন্ধান সব সময়ই দুই দেশের গভীর ট্রাস্ট ও ঐক্যের প্রতীক হিসেবে কাজ করেছে।
ভিডিওটিতে দেখা যায়, কসমোনটরা ভারতীয় তেরঙ্গার পাশাপাশি ভারত-রুশ যৌথ মহাকাশ অভিযানের ঐতিহাসিক কয়েকটি পোস্টার ও স্মারক প্রদর্শন করছেন। পোস্টারগুলিতে স্থান পেয়েছে ভারতের মহাকাশ যাত্রার স্মারক চিহ্ন, যৌথ মিশন এবং ভবিষ্যতের অগ্রগতির নানা খণ্ডচিত্র।

ইউরি গ্যাগারিনের মহাকাশ জয়ের ৬৫ বছর এবং ভারতের স্মৃতিচারণ

রুশ কসমোনটরা এই স্বাধীনতা দিবসের বার্তাকে মানব মহাকাশযাত্রার আরও একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক উদযাপনের সঙ্গে যুক্ত করেন। ২০২৬ সালটি হলো সোভিয়েত কসমোনট ইউরি গ্যাগারিনের মহাশূন্যে প্রথম মানব হিসেবে ইতিহাস গড়ার ৬৫তম বার্ষিকী। ১৯৬১ সালে ইউরি গ্যাগারিনের মহাশূন্য জয়ের পর, সেই বছরেরই নভেম্বর মাসে তিনি ভারত সফরে এসেছিলেন।
গ্যাগারিনের সেই ঐতিহাসিক ভারত সফর তৎকালীন আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও প্রযুক্তির জগতে এক সাড়া জাগানো ঘটনা ছিল। তৎকালীন ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু ও ভারতের জনগণের পক্ষ থেকে গ্যাগারিনকে অভূতপূর্ব সংবর্ধনা দেওয়া হয়েছিল।
মহাকাশ স্টেশন থেকে রুশ কসমোনটরা ইউরি গ্যাগারিনের সেই অমর উক্তি পুনর্ব্যক্ত করেন। গ্যাগারিন ভারতের রূপ ও মানুষের আতিথেয়তায় মুগ্ধ হয়ে বলেছিলেন:
“মহাশূন্য থেকে ওপর থেকে দেখলে ভারতকে অত্যন্ত সুন্দর দেখায়, কিন্তু পৃথিবীতে নেমে ভারতীয় ভূখণ্ড আরও অনেক বেশি সুন্দর ও বিশেষ মনে হয়, কারণ এটি প্রকৃত সুহৃদ ও বিশ্বস্ত বন্ধুদের বাসস্থান।”
কসমোনট আন্না কিকিনা (Anna Kikina) এই স্মৃতিচারণ করে বলেন যে, গ্যাগারিনের সেই কথাগুলো আজও ভারত ও রাশিয়ার সম্পর্কের মূল সুর নির্দেশ করে। সময় বদলালেও দুই দেশের মানুষের পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ও ভালোবাসার সম্পর্ক অপরিবর্তিত রয়েছে।

১৯৭৫ থেকে ১৯৮৪: ভারত-রুশ মহাকাশ সহযোগিতার সোনালী ভিত্তিপ্রস্তর

ভারত ও রাশিয়ার মহাকাশ সহযোগিতার ইতিহাস নিছক কিছু আনুষ্ঠানিক চুক্তি বা কূটনৈতিক আলোচনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং তা বাস্তব বৈজ্ঞানিক সাফল্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত।

১. ১৯৭৫: ‘আর্যভট্ট’ উৎক্ষেপণ

১৯৭৫ সালে ভারতের প্রথম কৃত্রিম উপগ্রহ ‘আর্যভট্ট’ যখন তৈরি হয়, তখন ভারতের নিজস্ব শক্তিশালী উৎক্ষেপণ যান (Launch Vehicle) ছিল না। তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন ভারতকে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে তাদের কসমোড্রোম (Kapustin Yar) এবং রকেট ব্যবহারের সুযোগ করে দেয়। ১৯৭৫ সালের ১৯ এপ্রিল সোভিয়েত রকেটের সাহায্যেই মহাকাশে পাড়ি জমায় আর্যভট্ট। এটি ছিল ভারতীয় মহাকাশ গবেষণা সংস্থা ইসরো (ISRO)-র জন্য এক যুগান্তকারী মুহূর্ত।

২. ১৯৮৪: রাকেশ শর্মার ঐতিহাসিক ‘সোয়ুজ টি-১১’ মিশন

১৯৮৪ সালে ভারতীয় বিমান বাহিনীর স্কোয়াড্রন লিডার রাকেশ শর্মা প্রথম ভারতীয় হিসেবে মহাকাশে যান। তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের সোয়ুজ টি-১১ (Soyuz T-11) মহাকাশযানে চেপে তিনি স্যাল্যুট-৭ (Salyut 7) মহাকাশ স্টেশনে পৌঁছান।
মহাকাশ থেকে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর প্রশ্নের উত্তরে রাকেশ শর্মা কবি ইকবালকে উদ্ধৃত করে উচ্চারণ করেছিলেন সেই বিখ্যাত বাক্য: “সারে জাঁহা সে আচ্ছা, হিন্দুস্তাঁ হামারা”। এই মিশনে তাঁর সফরসঙ্গী ছিলেন সোভিয়েত কসমোনট ইউরি মালিশেভ এবং গেনাদি স্ত্রেকালভ। এই মিশনটি দুই দেশের বৈজ্ঞানিক যৌথতার ইতিহাসে এক স্বর্ণাক্ষরে লেখা অধ্যায়।

‘গগনযান’ ও যৌথ অংশীদারিত্বের এক নতুন দিগন্ত: আন্না কিকিনার মূল্যায়ন

ভিডিও বার্তায় একমাত্র নারী রুশ কসমোনট আন্না কিকিনা ভারত-রাশিয়া মহাকাশ সহযোগিতার বর্তমান ও ভবিষ্যৎ রূপরেখা তুলে ধরেন। তিনি উল্লেখ করেন যে, প্রাচীন বন্ধুত্বের এই ধারা বর্তমানে ভারতের প্রথম নিজস্ব মানব মহাকাশযাত্রা কর্মসূচি ‘গগনযান’ (Gaganyaan)-এর মাধ্যমে এক নতুন ও রোমাঞ্চকর যুগে পদার্পণ করেছে।
ভারতের মহাকাশ গবেষণার সবচেয়ে উচ্চাকাঙ্ক্ষী প্রকল্প ‘গগনযান’-এর আওতায় ভারতীয় মহাকাশচারী বা ‘গগনযাত্রী’রা রাশিয়ার রাজধানী মস্কোর কাছে ঐতিহাসিক ‘ইউরি গ্যাগারিন কসমোনট ট্রেনিং সেন্টার’ (Gagarin Cosmonaut Training Center – GCTC)-এ নিবিড় প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেছেন।
রাশিয়ার অভিজ্ঞ প্রশিক্ষক ও কসমোনটরা ভারতীয় মনোনীত চার গগনযাত্রীকে শূন্য-মহাকর্ষ (Zero Gravity) পরিবেশের সাথে মানিয়ে নেওয়া, জরুরি অবতরণ (Emergency Ejection), মহাকাশযানের সিস্টেম নিয়ন্ত্রণ এবং শারীরবৃত্তীয় জটিলতা সামলানোর সর্বাধুনিক কৌশল শিখিয়েছেন।
আন্না কিকিনা বলেন:
“আমাদের এই বন্ধুত্ব সময়ের কষ্টিপাথরে পরীক্ষিত। মহাকাশ অনুসন্ধান আমাদের সার্বিক সহযোগিতার অন্যতম প্রধান স্তম্ভ। গগনযান মিশনের মাধ্যমে ভারতীয় গগনযাত্রীদের সাথে রাশিয়ান মহাকাশ বিজ্ঞানীদের যে আত্মিক যোগাযোগ তৈরি হয়েছে, তা আগামী দিনের যৌথ গবেষণাকে আরও অনেক দূর এগিয়ে নিয়ে যাবে।”

ইসরো ও রসকসমসের যৌথ প্রতিযোগিতা ও চিত্রপ্রদর্শনী

ভিডিও বার্তায় আরও একটি বিশেষ আকর্ষণের কথা উঠে আসে। রাশিয়ার মহাকাশ গবেষণা সংস্থা রসকসমস (Roscosmos), ভারতে তাদের প্রতিনিধি কার্যালয় এবং ভারতের ইসরো (ISRO) যৌথভাবে দুই দেশের তরুণ প্রজন্ম ও ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে একটি চিত্রাঙ্কন ও রচনা প্রতিযোগিতার আয়োজন করেছিল।
প্রতিযোগিতার বিষয়বস্তু ছিল: “ভারত-রাশিয়া মহাকাশ সহযোগিতা ও ভবিষ্যতের পথচলা”
ভারত ও রাশিয়ার অসংখ্য শিক্ষার্থীর মধ্য থেকে বাছাই করা সেরা কয়েকটি বিজয়ী শিল্পকর্ম ও পোস্টার আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে নিয়ে যাওয়া হয়। কসমোনটরা ভিডিও রেকর্ডিং করার সময় সেই বিজয়ী ছবিগুলো ব্যাকগ্রাউন্ডে প্রদর্শন করেন। বিশ্ব মহাকাশ বিজ্ঞানে দুই দেশের নতুন প্রজন্মের এই শৈল্পিক অংশগ্রহণ আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনের গবেষকদের দ্বারা প্রশংসিত হয়েছে।

“ভারত-রুশ মৈত্রী দীর্ঘজীবী হোক”: কসমোনট আন্দ্রে ফেদিয়ায়েভের শেষ বক্তব্য

ভিডিও বার্তার একেবারে শেষ পর্যায়ে কসমোনট আন্দ্রে ফেদিয়ায়েভ (Andrey Fedyaev) গর্বের সাথে ভারতীয় জাতীয় পতাকা উঁচিয়ে ধরেন। তিনি ভারতের জনগণকে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, অর্থনীতি ও মহাকাশ অনুসন্ধানে আরও নিত্যনতুন সাফল্য অর্জনের জন্য শুভকামনা জানান।
আন্দ্রে ফেদিয়ায়েভ স্পষ্ট উচ্চারণে বলেন:
“শুভ স্বাধীনতা দিবস, ভারত! ভারত ও রাশিয়ার মধ্যকার বন্ধুত্ব ও মহাকাশ মৈত্রী দীর্ঘজীবী হোক (Long live India-Russia friendship)!”

বিশ্ব কূটনীতি ও বৈজ্ঞানিক অগ্রগতিতে এই বার্তার তাত্পর্য

বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশন থেকে ভারতীয় তেরঙ্গা প্রদর্শন এবং এই উষ্ণ শুভেচ্ছা বার্তার কৌশলগত গুরুত্ব অপরিসীম।
১. কৌশলগত আত্মিক ঐক্য: বিশ্বজুড়ে নানা রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক পরিবর্তনের মধ্যেও দিল্লি ও মস্কোর সম্পর্ক যে অটুট রয়েছে, এই ঘটনাটি তারই এক বলিষ্ঠ বৈজ্ঞানিক প্রমাণপত্র।
২. প্রযুক্তিগত আদান-প্রদান: গগনযান মিশনে তরল রকেট ইঞ্জিন, স্পেস স্যুট ও লাইফ সাপোর্ট সিস্টেম সম্পর্কিত প্রযুক্তিতে রাশিয়া ও ভারতের মধ্যে গভীর জ্ঞান আদান-প্রদান অব্যাহত রয়েছে।
৩. ভবিষ্যতের স্পেস স্টেশন নির্মাণ: ভারত যখন ২০৩৫ সালের মধ্যে নিজেদের ‘ভারতীয় অন্তরীক্ষ স্টেশন’ (Bharatiya Antariksha Station – BAS) তৈরি এবং ২০৪০ সালের মধ্যে চাঁদে মানুষ পাঠানোর পরিকল্পনা করছে, তখন রাশিয়ার অভিজ্ঞতা ও প্রযুক্তিগত সহায়তা ভারতের জন্য এক বিশাল অনুঘটক হিসেবে কাজ করবে।
নয়াদিল্লির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি জগতের বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ রুশ কসমোনটদের এই অনন্য উদ্যোগ ও শুভেচ্ছা বার্তার জন্য গভীর ধন্যবাদ প্রকাশ করেছেন। মহাকাশ থেকে পাঠানো এই বার্তা প্রমাণ করে যে, ভৌগোলিক সীমানা পেরিয়ে যখন মহাবিশ্বের অসীম সম্ভাবনার দিকে নজর দেওয়া হয়, তখন ভারত ও রাশিয়ার বন্ধন আরও দৃঢ ও দেদীপ্যমান হয়ে ওঠে।
RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

spot_img

সবচেয়ে জনপ্রিয়