Annapurna Rakhi:ধোঁয়া ওঠা একথালা গরম ভাতের মধ্যে নাকি আশ্চর্য এক জাদু থাকে। তা পেটে পড়লে শরীরে বল ফিরে আসে, বেঁচে থাকার তৃপ্তি পাওয়া যায়। কিন্তু আমাদের চারপাশেই এমন অনেক মানুষ আছেন, যাঁদের কাছে এই একমুঠো গরম ভাতই সবচেয়ে বড় স্বপ্ন। তাঁদের এই স্বপ্নের বাস্তব রূপ দিতে বছরের পর বছর নিঃশব্দে কাজ করে যাচ্ছেন নদিয়ার কৃষ্ণগঞ্জের পাপিয়া কর।
পাপিয়া কোনো ধনকুবের নন, তবে তাঁর ইচ্ছেশক্তির জোর ষোলো আনা। স্বামী অমরেশ কর পেশায় সাধারণ সবজি বিক্রেতা, আর একমাত্র ছেলে হৃষিকেশ সদ্য ব্যাংকে চাকরি পেয়েছেন। পরিবারের এই সীমিত সামর্থ্য আর অসীম সমর্থনকে সম্বল করেই পাপিয়া গড়ে তুলেছেন তাঁর সমাজসেবামূলক উদ্যোগ ‘সরাইঘর’। রানাঘাটের বাপের বাড়ি থেকে শুরু করে কৃষ্ণগঞ্জের সত্যনগর—সবত্রই তাঁর পরিচিতি এক অনন্যা নারী হিসেবে। তিনি বিশ্বাস করেন, ক্ষুধার্ত মানুষের তৃপ্তির হাসির মধ্যেই ঈশ্বরের প্রকৃত বাস।
প্রতি বছর রাখি বন্ধন উৎসব এলে পাপিয়ার হাতের কাজ এক অন্য মাত্রা পায়। তাঁর নিজের হাতে তৈরি ‘অন্নপূর্ণা রাখি’ এখন দারুণ জনপ্রিয়। বাঙালির ঠাকুরঘরের মা অন্নপূর্ণার সেই অক্ষয় কলসের আদলেই তৈরি এই রাখি। ছোট একটি ঘট, তার মুখে ধানের ছড়া আর পাশে মাঙ্গলিক কড়ি—রং, উল ও জড়ি দিয়ে সাজানো এই রাখির দাম মাত্র ৫০ টাকা।
তবে এই রাখির প্রকৃত মূল্য টাকায় মাপা অসম্ভব। পাপিয়া যে রাখি তৈরি করছেন, তার প্রতিটি সুতোয় জড়িয়ে রয়েছে সমাজকল্যাণের অঙ্গীকার:
আবেগের সঙ্গে অন্নের যোগ: রাখি বন্ধনে ভাইয়ের মঙ্গল কামনার পাশাপাশি দেবী অন্নপূর্ণার কাছে অন্নের প্রার্থনা—এই দুই ভাবনাকে এক সুতোয় বেঁধেছেন তিনি।
ক্ষুধার্তের মুখে অন্নসংস্থান: এই রাখি বিক্রির সমস্ত অর্থ দিয়ে পাপিয়া রান্না করা গরম ভাত তুলে দেন গৃহহীন, নিরন্ন মানুষ এবং পথশিশুদের মুখে।
আনন্দ ভাগ করে নেওয়া: সপ্তাহের নির্দিষ্ট দিনে ধর্মতলার ট্রামডিপোর কাছে পথশিশুদের নিয়ে যেন উৎসব বসে। সেখানে খাবারের পাশাপাশি চলে পড়াশোনা, হস্তশিল্প শেখানো আর নতুন জামা কাপড়ের আনন্দ ভাগ করে নেওয়া।
শুধু রাখিই নয়, মাটি ও কাগজের শিল্পকর্মেও পাপিয়ার হাত যশস্বী। এমনকি কলকাতার মণ্ডপের জন্য দুর্গাপ্রতিমা তৈরির কাজও তিনি করেছেন দক্ষতার সঙ্গে। কিন্তু সমস্ত রূপশিল্পের উর্ধ্বে তাঁর কাছে বড় হয়ে উঠেছে মানুষের সেবার কাজ।
সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে দূর-দূরান্তে পৌঁছে যাচ্ছে তাঁর এই বিশেষ রাখি। বোনেরা যখন ভাইয়ের কব্জিতে এই অন্নপূর্ণা রাখি বেঁধে দেন, তখন অলক্ষ্যেই অন্য কোনো নিরন্ন শিশুর পাতে পৌঁছে যায় গরম ভাতের থালা। সুতোর টানে শুধু সম্পর্কের গাঢ়ত্বই বাড়ে না, মেটে কারো দীর্ঘদিনের ক্ষুধা। পাপিয়ার ‘অন্নপূর্ণা রাখি’ তাই কেবল একটি উৎসবের অনুষঙ্গ নয়, তা মানুষের পাশে মানুষ দাঁড়ানোর এক অনন্য প্রতীক।





