Homeউন্নয়নDesert-Themed Night Safari Zoo: মরুভূমির বুকে এশিয়ার প্রথম নাইট সাফারি: গুজরাটের বনাসকাঁটায়...

Desert-Themed Night Safari Zoo: মরুভূমির বুকে এশিয়ার প্রথম নাইট সাফারি: গুজরাটের বনাসকাঁটায় বন্যপ্রাণী পর্যটনে এক অভূতপূর্ব যুগান্তকারী অধ্যায়!!!

মরুভূমির বুকে এশিয়ার প্রথম নাইট সাফারি: গুজরাটের বনাসকাঁটায় বন্যপ্রাণী পর্যটনে এক অভূতপূর্ব যুগান্তকারী অধ্যায়

চিড়িয়াখানা বলতেই বিশ্বজুড়ে সাধারণত আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে সকালের সোনালী রোদে কিংবা বিকেলের আলোয় খাঁচা বা কৃত্রিম উন্মুক্ত পরিমণ্ডলে ঘুরে বেড়ানো নানাবিধ পশুপাখির রূপপট। তবে চিড়িয়াখানা দেখার শতবর্ষ প্রাচীন ও প্রথাগত এই অভিজ্ঞতায় এবার ঘটতে চলেছে এক বিশাল ও যুগান্তকারী পরিবর্তন। মরুভূমির আবহ ও বিশেষ বাস্তুতন্ত্রকে (Desert Ecosystem) কেন্দ্র করে ভারতে নির্মিত হতে চলেছে এক অভিনব জুলজিক্যাল পার্ক, যেখানে দর্শনার্থীরা দিনের বেলা সাধারণ চিড়িয়াখানা দেখার পাশাপাশি সূর্যাস্তের পর উপভোগ করতে পারবেন রোমাঞ্চকর ‘নাইট সাফারি’ (Night Safari)।

সমগ্র এশিয়ার মধ্যে এই ধরনের মরুভূমি-থিমভিত্তিক ডে-অ্যান্ড-নাইট সাফারি জুলজিক্যাল পার্ক এটিই প্রথম। সেন্ট্রাল জু অথরিটি (Central Zoo Authority – CZA)-র চূড়ান্ত অনুমোদন মিলতেই এই বৃহৎ প্রকল্পের কাজ গুজরাটে দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলেছে।

১. ভৌগোলিক অবস্থান ও স্থান নির্বাচন: কেন জুনা দিশা?

প্রকল্পটির জন্য গুজরাটের উত্তর সীমান্তে অবস্থিত ঐতিহাসিক বনাসকাঁটা (Banaskantha) জেলার জুনা দিশা (Juna Deesa) এলাকাকে নির্বাচন করা হয়েছে। বনাস নদীর অববাহিকা সংলগ্ন প্রায় ১০৩ হেক্টর (প্রায় ২৫৪ একর) প্রাকৃতিক ভূমির ওপর বিস্তৃত হবে এই বিশালাকার জুলজিক্যাল পার্ক।

  • প্রাকৃতিক আবহের সামঞ্জস্য: জুনা দিশা অঞ্চলের আবহাওয়া ও প্রাকৃতিক পরিবেশ প্রাকৃতিকভাবেই শুষ্ক ও আধা-শুষ্ক (Semi-arid)। বালিয়াড়ি, শুষ্ক গুল্মরাজির সান্নিধ্য এবং বনাস নদীর শুষ্ক অববাহিকা মরুময় অঞ্চলের নিশাচর বন্যপ্রাণীদের স্বাভাবিক চলাচলের জন্য অত্যন্ত অনুকূল।

  • কৌশলগত সংযোগ: এই পার্কটি এমন একটি স্থানে নির্মিত হচ্ছে যা আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ পর্যটকদের সহজে পৌঁছানোর সুবিধার্থে অত্যন্ত আদর্শ। গুজরাটের অন্যান্য বিখ্যাত পর্যটন কেন্দ্র যেমন আম্বাজী মন্দির ও নদাবেট ইন্দো-পাক বর্ডার পর্যটন সার্কিটের সাথে এটি যুক্ত হয়ে উত্তর গুজরাটকে বন্যপ্রাণী পর্যটনের এক প্রধান কেন্দ্রে পরিণত করবে।

২. দ্বৈত ব্যবস্থা: সকালে চিড়িয়াখানা, রাতে রোমাঞ্চকর সাফারি

এই প্রকল্পের প্রধান বৈপ্লবিক দিকটি লুকিয়ে রয়েছে এর দ্বৈত বা ‘ডুয়াল-অপারেশনাল’ পরিচালন নীতিতে:

  1. দিবাচর চিড়িয়াখানা (Day-time Zoo):

    সকালের আলোয় এটি কাজ করবে একটি অতি-আধুনিক বিশ্বমানের বোটানিক্যাল ও জুলজিক্যাল পার্ক হিসেবে। দর্শনার্থীরা হেঁটে বা পরিবেশবান্ধব গল্ফ কার্টে করে বিভিন্ন প্রাণী ও পাখির খাঁচা এবং উন্মুক্ত ঘেরা স্থান ঘুরে দেখতে পারবেন।

  2. রাতের নাইট সাফারি (Night-time Safari):

    সন্ধ্যা নামার সাথে সাথেই রূপান্তরিত হবে পার্কের আবহ। রাতের সাফারির জন্য ৫টি সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র ও সুসংরক্ষিত সাফারি এনক্লোজার তৈরি করা হচ্ছে। সেখানে বিশেষ ব্যাটারিচালিত ও গ্লাস-সুরক্ষিত সাফারি যানবাহনে চড়ে দর্শনার্থীরা অন্ধকার পরিমণ্ডলে প্রবেশ করবেন।

    • নিশাচর প্রাণীদের স্বাভাবিক আচরণ পর্যবেক্ষণ: অধিকাংশ মরুভূমির প্রাণী দিনের আলোয় প্রখর উত্তাপ থেকে বাঁচতে গর্তে বা গুল্মের ছায়ায় নিষ্ক্রিয় অবস্থায় ঘুমিয়ে থাকে। কিন্তু রাতের শীতল বাতাসে তারা মেতে ওঠে তাদের আসল জীবনযাত্রায়—যেমন শিকার সন্ধান, সামাজিক যোগাযোগ এবং নিজস্ব ভূখণ্ড টহল দেওয়া। এই নাইট সাফারির মাধ্যমে ভারতের দর্শনার্থীরা প্রথমবারের মতো নিশ্চুপ অন্ধকারের মাঝে এই নিশাচর প্রাণীদের সত্যিকারের জীবনযাত্রা স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করার বিরল সুযোগ পাবেন।

৩. বিপুল প্রাণীবৈচিত্র্য: দেশি ও বিদেশি প্রাণীর এক অনন্য মহাজোট

এই সুবিশাল মরুময় জুলজিক্যাল পার্কে দেশীয় প্রজাতির পাশাপাশি বিশ্বখ্যাত বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মরু অঞ্চলের প্রাণী স্থান পাবে। প্রাথমিক পরিকল্পনা অনুযায়ী এখানে প্রায় ৮৩টি ভিন্ন প্রজাতির মোট ২,৭০০টি পশুপাখি রাখার আন্তর্জাতিক বন্দোবস্ত করা হচ্ছে।

মূল উৎস / অঞ্চলপার্কের জন্য নির্ধারিত প্রধান প্রধান জীবপ্রজাতি
দেশীয় ও স্থানীয় শুষ্ক অঞ্চলের প্রাণীকৃষ্ণাঙ্গ হরিণ (Blackbuck), চিঙ্কারা (Chinkara), ভারতীয় বুনো গাধা (Khur / Indian Wild Ass), অতি বিরল ক্যারাকাল (Caracal), ভারতীয় নেকড়ে (Indian Wolf), ডোরাকাটা হায়েনা, মরুভূমির শেয়াল, এশীয় সিংহ (Asiatic Lion) এবং চিতা (Leopard)।
আন্তর্জাতিক (বিদেশি) এক্সোটিক প্রাণীআফ্রিকান ডুম-কালো গণ্ডার (Black Rhino), চিতা (Cheetah), লম্বা গ্রীবাসম্পন্ন জিরাফ, বিশেষ শিংযুক্ত সিমটার-হর্নড ওরিক্স (Scimitar Oryx), গ্রেভির জেব্রা, মিারক্যাট (Meerkat), চিম্পাঞ্জি, অস্ট্রেলীয় ক্যাঙ্গারু, ওয়ালাবি, ইমু এবং উটপাখি।

এছাড়াও এই বিস্তৃত ক্যাম্পাসে থাকবে একটি বিশাল কৃত্রিম উড়ন্ত পাখিরালয় (Aviary), বিশেষ সরীসৃপ পার্ক (Reptile House), প্রজাপতি উদ্যান (Butterfly Park) এবং মিষ্টি পানির জলজ প্রাণীদের জন্য এক আধুনিক অ্যাকোয়ারিয়াম।

৪. প্রায় ৫৪২ কোটি টাকার বিশাল বাজেট ও বিশ্বমানের আধুনিক অবকাঠামো

প্রকল্পটির গুরুত্ব ও বিশালাকৃতি বিবেচনা করে গুজরাট বন দফতর এবং রাজ্য সরকার মোট ৫৪২ কোটি ১৪ লক্ষ টাকা (₹542.14 Crore) বরাদ্দ করেছে। এই বিশাল অর্থের মাধ্যমে যেসব অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ও অবকাঠামো গড়ে তোলা হচ্ছে:

  • উন্নত পশুচিকিৎসালয় ও আইসিইউ: প্রাণীদের শারীরিক সুরক্ষায় থাকবে বিশ্বমানের সার্জারি ইউনিট, এক্স-রে, ক্যাথ-ল্যাব ও বিশেষ কোয়ারেন্টাইন ওয়ার্ড।

  • সংরক্ষণ ও প্রজনন কেন্দ্র (Captive Breeding): বিলুপ্তপ্রায় ও সংকটাকুল মরু প্রজাতির সংখ্যা বৃদ্ধির জন্য কৃত্রিম প্রজনন ও বৈজ্ঞানিক গবেষণা কেন্দ্র।

  • সফট মুনলাইট লাইটিং প্রযুক্তি: রাতে সাফারির সময় প্রাণীরা যাতে কোনো আলো বা শব্দে বিচলিত না হয়, তার জন্য বিশেষ তরঙ্গদৈর্ঘ্যের ‘স্মার্ট মুনলাইট এলইডি’ পরিবেশ তৈরি করা হবে।

  • গ্রিন টেকনোলজি ও জিরো-ওয়েস্ট ক্যাম্পাস: পুরো পার্কটি পরিচালনায় সৌরশক্তি এবং বর্জ্য জল পুনর্ব্যবহারযোগ্য (Water Recycling & Sewage Treatment) ব্যবস্থা ব্যবহৃত হবে।

৫. পর্যটন অর্থনীতি ও পরিবেশ সচেতনতায় নতুন মাইলফলক

এই প্রজেক্ট কেবল বন্যপ্রাণী দেখার মধ্যেই সীমিত থাকবে না। এটি গুজরাট তথা সমগ্র ভারতের পর্যটন মানচিত্রে এক নতুন যুগের সূচনা করবে:

  • অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান: জুনা দিশা ও বনাসকাঁটা জেলায় শত শত হোটেল, রিসোর্ট, গাইড সার্ভিস এবং পরিবহন ব্যবস্থার প্রসার ঘটবে। এতে স্থানীয় হাজার হাজার যুবকের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কর্মসংস্থান তৈরি হবে।

  • শিক্ষা ও পরিবেশ সচেতনতা: শিশু ও শিক্ষার্থীদের জন্য থাকবে একটি পরিবেশ কেন্দ্র (Interpretation Center), যেখানে মরুভূমির বাস্তুতন্ত্র, বৈশ্বিক উষ্ণায়ন এবং বন্যপ্রাণী সুরক্ষার প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে বিস্তারিত শিক্ষা দেওয়া হবে।

মরুভূমির থিম, দিনের আলোয় বিশ্বমানের চিড়িয়াখানা এবং সূর্যাস্তের পর রোমাঞ্চকর নাইট সাফারি—এই তিনের অপূর্ব মেলবন্ধনে জুনা দিশায় গড়ে ওঠা জুলজিক্যাল পার্কটি হতে চলেছে ভারতের বন্যপ্রাণী পর্যটনের এক মুকুটমণি। ১০৩ হেক্টর জমিতে ২,৭০০ পশুপাখির এই নিরাপদ নীড় কেবল বিনোদন জোগাবে না, বরং পরিবেশ সংরক্ষণ ও বন্যপ্রাণী চিকিৎসার ক্ষেত্রে এশিয়ার বুকে এক অগ্রগামী আন্তর্জাতিক রোল-মডেল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে।

আরও পড়ুন: Beyond Chemistry:গন্ধের রূপকথা থেকে বিজ্ঞানের অলিগলি, স্মেল ট্রেনিং ও মগজের ঘ্রাণপুরাণ!!!

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

spot_img

সবচেয়ে জনপ্রিয়