Homeব্লগIndependence Day: রক্তে লেখা ইতিহাস, যে বীরাঙ্গনাদের অদম্য সাহস ও আত্মত্যাগ বদলে...

Independence Day: রক্তে লেখা ইতিহাস, যে বীরাঙ্গনাদের অদম্য সাহস ও আত্মত্যাগ বদলে দিয়েছিল ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের গতিপথ!!!

রক্তে লেখা ইতিহাস: যে বীরাঙ্গনাদের অদম্য সাহস ও আত্মত্যাগ বদলে দিয়েছিল ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের গতিপথ

 ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাস কেবল সশস্ত্র সংগ্রাম কিংবা শীর্ষপুরুষ জননেতাদের লড়াইয়ের গল্প নয়; এটি লাখো নারীর অলৌকিক সাহস, অসীম আত্মত্যাগ এবং আপসহীন সংগ্রামের এক অমর মহাকাব্য। পরাধীনতার শৃঙ্খল ভাঙার লড়াইয়ে ভারতীয় নারীরা কেবল পুরুষদের সহযোগী ছিলেন না, বরং যুদ্ধক্ষেত্র থেকে শুরু করে রাজপথ, গোপন বেতার কেন্দ্র থেকে আন্দামানের অন্ধকার প্রকোষ্ঠ পর্যন্ত তাঁরা ছিলেন সামনের সারির সেনাপতি।
১৮৫৭ সালের প্রথম স্বাধীনতা যুদ্ধ থেকে শুরু করে ১৯৪২-এর ভারত ছাড়ো আন্দোলন এবং আজাদ হিন্দ ফৌজের সশস্ত্র সংগ্রাম—প্রতিটি বাঁকেই নারীদের রক্ত ও ঘাম বদলে দিয়েছিল ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের গতিপথ।

১. রানি লক্ষ্মীবাই: ১৮৫৭-র অগ্নিশিখা ও অদম্য প্রতিরোধের প্রতীক

১৮৫৭ সালের সিপাহি বিদ্রোহ তথা ভারতের প্রথম স্বাধীনতা সংগ্রামের কথা উঠলেই যে নামটি প্রথম উচ্চারিত হয়, তা হলো ঝাঁসির রানি লক্ষ্মীবাই। ডালহৌসির নির্দয় ‘স্বত্ববিলোপ নীতি’ (Doctrine of Lapse)-র মাধ্যমে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি যখন ঝাঁসি রাজ্যকে গ্রাস করতে উদ্যত হয়, তখন রানি হুঙ্কার দিয়ে উঠেছিলেন— “ম্যায় মেরি ঝাঁসি নেহি দুঙ্গি” (আমি আমার ঝাঁসি দেব না)।
লক্ষ্মীবাই কেবল নামমাত্র শাসক ছিলেন না; তিনি ছিলেন একজন দক্ষ সমরকুশলী এবং অশ্বারোহী যোদ্ধা। পিঠে নিজের ছোট সন্তানকে বেঁধে, দুই হাতে তলোয়ার নিয়ে ঘোড়ায় চেপে শত্রুব্যূহ ভেদ করে বেরিয়ে গিয়েছিলেন তিনি। ব্রিটিশ জেনারেল হিউ রোজ পরবর্তীতে তাঁর স্মৃতিকথায় লিখেছিলেন— “বিদ্রোহীদের মধ্যে রানি লক্ষ্মীবাই ছিলেন সবচেয়ে বিপজ্জনক ও সাহসী নেতা।”

২. বেগম হজরত মহল: আওধের অপ্রতিরোধ্য নেত্রী

১৮৫৭ সালের বিদ্রোহের ইতিহাসের আরও এক তেজস্বী নক্ষত্র ছিলেন আওধের বেগম হজরত মহল। নবাব ওয়াজিদ আলি শাহকে ব্রিটিশরা অন্যায়ভাবে নির্বাসিত করার পর, আওধের দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নেন বেগম। নিজের নাবালক পুত্র বিরজিস কদরকে সিংহাসনে বসিয়ে তিনি ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ ঘোষণা করেন।
কৃষক, জমিদার এবং সাধারণ মানুষকে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ করতে তাঁর ভূমিকা ছিল অনবদ্য। লখনউয়ের পতনের পর তিনি ব্রিটিশদের কাছে আত্মসমর্পণ করার চেয়ে নেপালের জঙ্গলে নির্বাসিত জীবন বেছে নেওয়াকে শ্রেয় মনে করেছিলেন।

৩. উষা মেহতা: সেন্সরশিপের দেয়াল ভেঙে ‘কংগ্রেস রেডিও’-র গোপন কণ্ঠস্বর

১৯৪২ সালের ‘ভারত ছাড়ো আন্দোলন’ যখন তুঙ্গে, তখন ব্রিটিশ সরকার প্রেসের ওপর চরম সেন্সরশিপ জারি করে। সমস্ত প্রধান কংগ্রেস নেতাদের গ্রেপ্তার করা হয়। ঠিক এই সংকটময় মুহূর্তে তরুণী উষা মেহতা গড়ে তোলেন এক গোপন বেতার কেন্দ্র—’কংগ্রেস রেডিও’।
ব্রিটিশ গোয়েন্দাদের চোখ ফাঁকি দিয়ে প্রতিদিন ভিন্ন ভিন্ন স্থান থেকে ১৯৪২ সালের ২৭ আগস্ট প্রথম প্রচারিত হয়: “দিস ইজ কংগ্রেস রেডিও কলিং…”। ৩ মাস পর তিনি গ্রেপ্তার হন এবং চরম মানসিক ও শারীরিক নির্যাতনের শিকার হন, কিন্তু কোনো সহযোগীর নাম প্রকাশ করেননি।

৪. ক্যাপ্টেন লক্ষ্মী সাহগল: আজাদ হিন্দ ফৌজের ‘রানি ঝাঁসি রেজিমেন্ট’-এর কাণ্ডারী

পেশায় চিকিৎসক হলেও হৃদয়ে তিনি বহন করতেন মুক্তিকামী ভারতের স্বপ্ন। ডা. লক্ষ্মী সাহগল ১৯৪৩ সালে সিঙ্গাপুরে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর সংস্পর্শে আসেন। নেতাজির আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে তিনি আজাদ হিন্দ ফৌজের ‘রানি ঝাঁসি রেজিমেন্ট’-এর নেতৃত্ব গ্রহণ করেন।
ক্যাপ্টেন লক্ষ্মী নারীদের কঠোর সামরিক প্রশিক্ষণ, রাইফেল চালনা ও যুদ্ধের রণকৌশল শিখিয়ে পূর্ণাঙ্গ সৈনিকে পরিণত করেছিলেন। মায়ানমারের জঙ্গলে ব্রিটিশ বাহিনীর বিরুদ্ধে রানি ঝাঁসি রেজিমেন্টের নারীরা যে সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছিলেন, তা বিশ্ব সামরিক ইতিহাসে বিরল।

৫. সরোজিনী নাইডু: আন্দোলনের অদম্য কণ্ঠ ও ‘ভারতের নাইটিঙ্গেল’

কবি ও রাজনীতিক সরোজিনী নাইডু ছিলেন ভারতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ। ১৯৩০ সালের লবণ সত্যগ্রহ এবং ঐতিহাসিক ধরসানা লবণ কারখানায় অহিংস আন্দোলনের সময় তিনি যে সাহসিকতা দেখিয়েছিলেন, তা ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে আছে।
অনবদ্য বক্তা হিসেবে সরোজিনী নাইডু কেবল দেশের মাটিতেই নয়, আন্তর্জাতিক মঞ্চেও ভারতের স্বাধীনতার দাবি অত্যন্ত জোরালোভাবে তুলে ধরেছিলেন। বহুবার কারাবরণ করা সত্ত্বেও ব্রিটিশ সরকারের কোনো অত্যাচার তাঁর মনোবল ভাঙতে পারেনি।

৬. মাতঙ্গিনী হাজরা: ৭৩ বছরের বৃদ্ধার হাতে উড়ন্ত তেরঙ্গা

মেদিনীপুরের তমলুকের ‘গান্ধী বুড়ি’ মাতঙ্গিনী হাজরা ছিলেন অদম্য আত্মত্যাগের এক নজিরবিহীন উদাহরণ। ১৯৪২ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর ‘ভারত ছাড়ো আন্দোলন’-এর সময় ৭৩ বছর বয়সে তমলুক থানা দখলের মিছিলে হাতে জাতীয় পতাকা নিয়ে একদম সামনে থেকে নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন তিনি।
পুলিশ গুলি চালালে পর পর কয়েকটি গুলি তাঁর শরীরে বিদ্ধ হয়। মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ার শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তিনি জাতীয় পতাকাকে মাটিতে পড়তে দেননি এবং তাঁর কণ্ঠে ছিল “বন্দে মাতরম্” ধ্বনি।

৭. নীরা আর্য: আন্দামানের কালাপানিতে চরম অত্যাচার সহ্য করা প্রথম মহিলা গুপ্তচর

আজাদ হিন্দ ফৌজের রানি ঝাঁসি রেজিমেন্টের এক সাহসী সদস্য এবং প্রথমদিকের অন্যতম মহিলা গুপ্তচর ছিলেন নীরা আর্য। নেতাজির প্রাণ রক্ষার জন্য নীরা তাঁর স্বামী (যিনি ব্রিটিশ সিআইডি অফিসার ছিলেন) কে হত্যা করেছিলেন।
এর পর তাঁকে আন্দামানের সেলুলার জেলে (কালাপানি) স্থানান্তরিত করা হয়। আন্দামানের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে নেতাজির গোপন তথ্য সংগ্রহের জন্য ব্রিটিশ রক্ষীরা তাঁর ওপর অমানুষিক শারীরিক নির্যাতন চালায়, কিন্তু নীরা আর্য দেশের স্বার্থে শত্রুর কাছে তিল পরিমাণ মাথা নত করেননি।
ভারতের স্বাধীনতা কেবল কোনো একক রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত বা পুরুষের অর্জিত ফসল নয়। রানি লক্ষ্মীবাই থেকে নীরা আর্য—এই নারীরা প্রমাণ করেছিলেন যে দেশমাতৃকার পরাধীনতার শৃঙ্খল ভাঙতে নারীরা রাজপ্রাসাদের অহংকার ছেড়ে যেমন যুদ্ধক্ষেত্রে নামতে পারেন, তেমনি সাধারণ ঘরের গৃহবধূ থেকে হয়ে উঠতে পারেন অদম্য বিপ্লবী। তাঁদের রক্তে লেখা এই মহাকাব্য যুগ যুগ ধরে স্বাধীন ভারতের চেতনাকে অনুপ্রাণিত করবে।
RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

spot_img

সবচেয়ে জনপ্রিয়