Shantiniketan Medical College &Hospital:পৃথিবীতে প্রতিটি মা-বাবার কাছে তাদের সন্তানের হাসিমুখই সবচেয়ে বড় সম্পদ। কিন্তু যখন সেই মুখে থ্যালাসেমিয়ার মতো দীর্ঘস্থায়ী এবং কষ্টকর রোগের ছায়া পড়ে, তখন পরিবারের প্রতিটি দিন হয়ে ওঠে অনিশ্চয়তা ও দুশ্চিন্তায় ভরা। নিয়মিত রক্ত সঞ্চালন, চিকিৎসার আকাশছোঁয়া খরচ এবং ভবিষ্যতের প্রতি মুহূর্তে দানা বাঁধা উদ্বেগ মিলিয়ে থ্যালাসেমিয়া শুধু এক রোগ নয়, এক অবিরাম সংগ্রাম। ঠিক এমন একটি মুহূর্তেই যেন বোলপুরের শান্তিনিকেতন মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল এক নতুন আলোর দিশারী হয়ে উঠল।
বোলপুর থেকে আসা এক সাম্প্রতিক সংবাদ অনুযায়ী, শান্তিনিকেতন মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল ১৪ জন তরুণ-তরুণী থ্যালাসেমিয়া আক্রান্ত রোগীর জীবনে এক নতুন প্রাণের সঞ্চার করেছে। এই হাসপাতাল, মুম্বইয়ের কোকিলাবেন ধীরুভাই আম্বানি রিসার্চ সেন্টারের সাথে হাত মিলিয়ে, সম্পূর্ণ বিনামূল্যে সফলভাবে বোন ম্যারো প্রতিস্থাপন সম্পন্ন করেছে। এই মহান উদ্যোগে প্রায় ৭ কোটি টাকার বিপুল খরচ সম্পূর্ণভাবে এই যৌথ প্রচেষ্টার মাধ্যমেই বহন করা হয়েছে, ফলে রোগী বা তাদের পরিবারের ওপর কোনো আর্থিক বোঝা পড়েনি।
আশা এবং উন্নত চিকিৎসার এক বিরল উদাহরণ
এই বছরের এপ্রিলে শান্তিনিকেতন মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে একটি বিশেষ থ্যালাসেমিয়া স্ক্রিনিং এবং মূল্যায়ন শিবির আয়োজন করা হয়েছিল। সেখানে অত্যাধুনিক পরীক্ষার পর চিকিৎসকেরা নিশ্চিত হন যে, এই ১৪ জন রোগীর ক্ষেত্রেই ১০০ শতাংশ ‘এইচএলএ’ (HLA) ম্যাচ পাওয়া গেছে। এটি সফল বোন ম্যারো প্রতিস্থাপনের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয় একটি বিষয়, যা এই রোগীদের সুস্থ জীবনের স্বপ্ন দেখিয়েছিল।
এই ১৪ জন জীবনদায়ী চিকিৎসার সুযোগ পেয়েছেন। তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন– মঙ্গলীপ বৈদ, অনিমেষ করণ, রিয়া খাতুন, তানভী সুলতানা, সুলতানা পারভিন, মহম্মদ ইমতিয়াজ আলম, সুমাইয়া খাতুন, মিরজানু খাতুন, অনন্ত রামু, রেহান শেষ, সৈয়দ আবদুল্লাহ সিদ্দিকী, সুমন মুর্মু, মহম্মদ বরকত উল্লাহ এবং অচিত্র দুলুই।
চিকিৎসার মানবিক রূপ
শান্তিনিকেতন মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের ডিরেক্টর অধ্যাপক ডাঃ অশোক কুমার দত্ত জানিয়েছেন, “মেজর থ্যালাসেমিয়ার স্থায়ী ও কার্যকর চিকিৎসার অন্যতম প্রধান উপায় হল বোন ম্যারো প্রতিস্থাপন। কিন্তু বিপুল ব্যয়ের কারণে অধিকাংশ পরিবারের পক্ষে এই চিকিৎসা করানো সম্ভব হয় না।” তিনি আরও বলেন যে, অর্থের অভাবে যেন কোনো রোগী জীবনরক্ষাকারী চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত না হন, সেই লক্ষ্যেই এই মানবিক উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে।
এই উদ্যোগটি কেবল চিকিৎসা প্রদানই নয়, এটি একটি মানুষের প্রতি ভালোবাসা এবং মানবিক দায়িত্ববোধের এক অনন্য উদাহরণ। চিকিৎসার পেশাকে ছাপিয়ে জনসেবার মহান ব্রত নিয়ে শান্তিনিকেতন মেডিকেল কলেজ এই ঐতিহাসিক কৃতিত্ব অর্জন করেছে। এটি প্রমাণ করে যে, আধুনিক চিকিৎসার শক্তি শুধু প্রযুক্তিতে নয়, বরং মানুষের প্রতি মমতা এবং দায়বদ্ধতার মধ্যেও নিহিত। এই ১৪ জন রোগীর সুস্থতা এখন শুধু তাদের ব্যক্তিগত জয় নয়, বরং তা সমাজের এক যৌথ উদ্যোগের সফলতার গল্প।
উপসংহার
শান্তিনিকেতন মেডিকেল কলেজের এই সফল বোন ম্যারো প্রতিস্থাপন শুধু বীরভূম নয়, গোটা দেশের চিকিৎসাক্ষেত্রের জন্য একটি অনুপ্রেরণা। এটি দেখিয়ে দিল যে, সঠিক মানসিকতা ও সহযোগিতার মাধ্যমে চিকিৎসার সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছানো এবং সুবিধাবঞ্চিত মানুষের জীবনে পরিবর্তন আনা সম্ভব। এটি শুধুমাত্র একটি চিকিৎসা নয়, এটি জীবনের নতুন ভোর।





