স্বপ্ন যখন ডানায় ভর করে: গুঞ্জন সাক্সেনা ও ‘দ্য কার্গিল গার্ল’-এর ঐতিহাসিক জীবনগাথা
ভারতীয় বিমান বাহিনীর ইতিহাসে যেক’টি নাম সোনালী অক্ষরে লেখা রয়েছে, তার মধ্যে ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট (অবসরপ্রাপ্ত) গুঞ্জন সাক্সেনার নাম অন্যতম। ১৯৯৯ সালের ভয়াবহ কার্গিল যুদ্ধের সময় শত্রুদেশের গোলাবর্ষণের মুখে দাঁড়িয়ে জীবন বাজি রেখেছিলেন এই সাহসী নারী। যুদ্ধক্ষেত্রে হেলিকপ্টার উড়িয়ে শত শত আহত ভারতীয় সেনাকে উদ্ধার করে এনে তিনি লাভ করেছিলেন ‘কার্গিল গার্ল’ (The Kargil Girl) উপাধি। পরবর্তীতে ২০২০ সালে তাঁর এই অসাধারণ বীরত্বপূর্ণ ও অনুপ্রেরণাদায়ক জীবনের ওপর ভিত্তি করে নির্মিত হয় বলিউড বায়োপিক ‘গুঞ্জন সাক্সেনা: দ্য কার্গিল গার্ল’।
১. শৈশবের স্বপ্ন থেকে ককপিটের স্বপ্নযাত্রা
১৯৭৫ সালে এক সামরিক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন গুঞ্জন সাক্সেনা। তাঁর পিতা সেনাবাহিনীতে কর্মরত ছিলেন এবং ভাইও দেশের সেবায় নিজেকে নিয়োজিত করেছিলেন। ফলে ছোটবেলা থেকেই সামরিক অনুশাসন, দেশপ্রেম এবং সাহসিকতার আবহাওয়াতেই বেড়ে ওঠেন গুঞ্জন।
মাত্র ৫ বছর বয়সে ককপিট দেখার পর থেকেই আকাশে ওড়ার এক অদম্য স্বপ্ন তাঁর মনে বাসা বাঁধে। দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের মর্যাদাপূর্ণ হাঁসরাজ কলেজ থেকে পদার্থবিজ্ঞানে স্নাতক ডিগ্রি অর্জনের পর, তিনি সাফদারজং ফ্লাইং ক্লাব থেকে বিমান চালনার প্রাথমিক প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। ১৯৯৪ সালে যখন ভারতীয় বিমান বাহিনী (IAF) নারী অফিসারদের জন্য দরজা উন্মুক্ত করে, তখন গুঞ্জন সেই সুবর্ণ সুযোগটি গ্রহণ করেন এবং পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে প্রবেশ করেন।
২. পুরুষতান্ত্রিক সমাজের সাথে অদৃশ্য সংগ্রাম
নব্বইয়ের দশকে প্রতিরক্ষা বাহিনীর মতো একটি সম্পূর্ণ পুরুষশাসিত ক্ষেত্রে একজন নারীর টিকে থাকা সহজ ছিল না। বিমান বাহিনীতে নারীদের জন্য আলাদা চেঞ্জিং রুম বা শৌচাগারের সুবিধা ছিল না বললেই চলে। সহকর্মীদের মানসিকতায় নারী পাইলটদের গ্রহণ করার ক্ষেত্রে এক অদৃশ্য দ্বিধা এবং লিঙ্গবৈষম্য কাজ করত।
তবে গুঞ্জন সাক্সেনাকে কোনো শারীরিক প্রতিকূলতা বা সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি দমাতে পারেনি। প্রতিকূল পরিস্থিতিতে নিজেকে প্রমাণ করার জন্য কঠোর পরিশ্রম করেছেন তিনি। এই দীর্ঘ সংগ্রামের পথে সবচেয়ে বড় ভিত্তিপ্রস্তর ছিলেন তাঁর পিতা অনুপ কুমার সাক্সেনা, যিনি সামাজিক বাধা উপেক্ষা করে মেয়েকে সবসময় নিজের স্বপ্নে অটল থাকতে উৎসাহিত করেছিলেন।
৩. ১৯৯৯-এর কার্গিল যুদ্ধ: ‘অপারেশন বিজয়’ ও ‘অপারেশন সেফদ সাগর’
১৯৯৯ সালে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে কার্গিল যুদ্ধ শুরু হলে জম্মু ও কাশ্মীরের উদমপুর ঘাঁটিতে কর্মরত ছিলেন ২৪ বছর বয়সী গুঞ্জন সাক্সেনা। ‘অপারেশন বিজয়’ এবং ‘অপারেশন সেফদ সাগর’-এর অধীনে কার্গিল, দ্রাস ও বাটালিকের অতি বিপজ্জনক ও দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় মিশন পরিচালনার দায়িত্ব পড়ে তাঁর ওপর।
ঝুঁকিপূর্ণ কপ্টার উড্ডয়ন: হালকা ও নিরস্ত্র চিতাহ (Cheetah) হেলিকপ্টার নিয়ে শত্রুদেশের মিসাইল ও গোলাবর্ষণের মধ্যে উড়ে গিয়েছেন তিনি।
৯০০-র বেশি সৈন্য উদ্ধার: দুর্গম পর্বত চূড়া থেকে ৯০০ জনেরও বেশি আহত এবং শহীদ সেনাসদস্যকে সফলভাবে এয়ারলিফ্ট করেন গুঞ্জন।
পাহাড়ি সার্ভেইল্যান্স: যুদ্ধের কৌশলগত দিক নির্ধারণের জন্য শত্রুঘাঁটির অবস্থান পর্যবেক্ষণ ও রিপোর্ট তৈরির কাজেও অংশ নেন তিনি।
তাঁর এই অসমসাহসিকতার ফলে একাধিকবার অল্পের জন্য নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা পান তিনি। একপর্যায়ে শত্রুর রকেট লঞ্চার দ্বারা তাঁর কপ্টার আক্রান্ত হলেও অবিশ্বাস্য দক্ষতায় তিনি তা নিরাপদে ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হন।
৪. কার্গিল যুদ্ধ ও বাস্তব জীবনের পরিসংখ্যান
| বিবরণ | তথ্য ও পরিসংখ্যান |
| জন্ম সাল ও স্থান | ১৯৭৫, লখনউ, উত্তর প্রদেশ |
| সামরিক পদবী | ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট (অবসরপ্রাপ্ত) |
| অংশগ্রহণকৃত যুদ্ধ | ১৯৯৯ সালের কার্গিল যুদ্ধ |
| ব্যবহৃত এয়ারক্রাফট | চিতাহ (Cheetah) হেলিকপ্টার |
| উদ্ধারকৃত সেনাসদস্য | ৯০০ জনেরও বেশি আহত ও শহীদ সেনা |
| সার্ভিসের মেয়াদ | ১৯৯৪ – ২০০৪ (৮ বছর শর্ট সার্ভিস কমিশন) |
৫.পরবর্তী জীবন ও আগামীর নারীর জন্য বার্তা
২০০৪ সালে আট বছরের সফল সার্ভিস শেষে সংক্ষিপ্ত সার্ভিস কমিশনের নিয়ম অনুযায়ী গুঞ্জন সাক্সেনা বিমান বাহিনী থেকে অবসর গ্রহণ করেন। তাঁর স্বামী উইং কমান্ডার গৌতম নারায়ণও ভারতীয় বিমান বাহিনীর একজন দক্ষ পাইলট।
আজকের দিনে দাঁড়িয়ে গুঞ্জন সাক্সেনা কেবল একটি নাম নন; তিনি হাজার হাজার তরুণীর কাছে সামাজিক শৃঙ্খল ভেঙে নিজের লক্ষ্যে এগিয়ে যাওয়ার এক জীবন্ত অনুপ্রেরণা। স্টিরিওটাইপ বা সমাজের তৈরি করে দেওয়া কোনো গণ্ডি যে একজন নারীর স্বপ্নপূরণের পথে বাধা হতে পারে না, তা তিনি নিজের জীবন দিয়ে প্রমাণ করে গেছেন।
“মেয়ে হোক বা ছেলে, বিমান চালাতে কেবল চালকের দক্ষতার প্রয়োজন হয়, লিঙ্গের নয়।” — গুঞ্জন সাক্সেনা





