৯৭-এও থামেনি জ্ঞানের যাত্রা ভোর ৩টেয় দিন শুরু করে আজও পদার্থবিদ্যার ক্লাসে চিলুকুরি সন্তাম্মা, অবসরকে যিনি দেখেন নতুন শিক্ষার শুরু হিসেবে
বয়স তাঁর ৯৭ বছর। জীবনের প্রায় এক শতাব্দীর কাছাকাছি সময় পেরিয়ে গেলেও জ্ঞানচর্চা, গবেষণা এবং শিক্ষকতার প্রতি তাঁর আগ্রহে যেন একটুও ভাটা পড়েনি। যখন বয়সের ভারে অধিকাংশ মানুষ ধীরে ধীরে দৈনন্দিন ব্যস্ততা কমিয়ে বিশ্রামকে জীবনের প্রধান অংশ করে তোলেন, তখন চিলুকুরি সন্তাম্মার দিন শুরু হয় ভোররাত প্রায় ৩টেয়। নিজের হাতে খাবার তৈরি করেন, সেই খাবার সঙ্গে নিয়ে বেরিয়ে পড়েন বিশ্ববিদ্যালয়ের পথে। গন্তব্য কোনও অবসরযাপন কেন্দ্র নয়, গন্তব্য শ্রেণিকক্ষ। সেখানে অপেক্ষা করে পদার্থবিদ্যার পাঠ।
চিলুকুরি সন্তাম্মার জীবনকাহিনি তাই শুধুমাত্র একজন প্রবীণ অধ্যাপিকার কর্মজীবনের ইতিহাস নয়। এটি অধ্যবসায়, জ্ঞানপিপাসা, শিক্ষকতার প্রতি দায়বদ্ধতা এবং বয়সকে অজুহাত না বানানোর এক অসাধারণ উদাহরণ। ১৯৫৬ সালে অন্ধ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের কলেজ অব সায়েন্সে প্রভাষক হিসেবে যে পথচলা শুরু হয়েছিল, প্রায় সাড়ে তিন দশক পর ১৯৮৯ সালে আনুষ্ঠানিক অবসর গ্রহণের পরও সেই পথ থামেনি।
বরং সময় যত গড়িয়েছে, তাঁর জ্ঞানচর্চার পরিধি ততই বিস্তৃত হয়েছে। পদার্থবিদ্যার গবেষণাগার থেকে ভারতীয় দর্শন, বেদ, উপনিষদ এবং বৈদিক গণিত—বহুমুখী আগ্রহে নিজেকে যুক্ত রেখেছেন তিনি। তাঁর তত্ত্বাবধানে ১৭ জন গবেষক পিএইচডি এবং চারজন এমফিল সম্পূর্ণ করেছেন। বিদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণার অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন। নিজের প্রায় ১০ কোটি টাকা মূল্যের বাড়ি চিকিৎসা পরিষেবার কাজে দান করেছেন।
সব মিলিয়ে চিলুকুরি সন্তাম্মার জীবন যেন একটি বার্তাই দেয়—বয়স কেবল ক্যালেন্ডারের সংখ্যা, জ্ঞান অর্জন ও জ্ঞান বিলিয়ে দেওয়ার কোনও নির্দিষ্ট অবসরকাল নেই।
ভোররাতেই শুরু হয় দিনের প্রস্তুতি
সন্তাম্মার দৈনন্দিন জীবন শুনলে অনেকের কাছেই তা অবিশ্বাস্য মনে হতে পারে। ৯৭ বছর বয়সে যেখানে দীর্ঘ সময় বিশ্রাম নেওয়াটাই স্বাভাবিক, সেখানে তাঁর দিনের সূচনা হয় ভোররাত ৩টার কাছাকাছি।
ঘুম থেকে উঠে নিজের প্রয়োজনীয় কাজ সেরে নেন। নিজের খাবার নিজেই তৈরি করেন। তারপর সেই খাবার সঙ্গে নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্দেশে যাত্রা করেন। তাঁর কাছে এই যাত্রা কোনও বিশেষ দিনের ঘটনা নয়, বরং দীর্ঘদিনের অভ্যাস।
বিশ্ববিদ্যালয়ে পৌঁছে তাঁর পরিচয় আবারও সেই শিক্ষক—যিনি শ্রেণিকক্ষে দাঁড়িয়ে শিক্ষার্থীদের সামনে পদার্থবিদ্যার জটিল বিষয়কে সহজভাবে তুলে ধরেন। বয়স তাঁর কাছে শিক্ষকতার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি।
এই বয়সেও নিয়মিত পড়াতে যাওয়ার বিষয়টি যতটা শারীরিক সক্ষমতার পরিচয়, তার চেয়েও বেশি মানসিক দৃঢ়তার প্রতিফলন। শিক্ষকতা তাঁর কাছে শুধু একটি পেশা নয়; এটি জীবনের সঙ্গে মিশে থাকা এক দায়িত্ব।
ছোটবেলা থেকেই পড়াশোনায় অসাধারণ আগ্রহ
১৯২৯ সালের ৮ মার্চ অন্ধ্রপ্রদেশের মছলিপত্তনমে জন্ম চিলুকুরি সন্তাম্মার। শৈশব থেকেই পড়াশোনার প্রতি তাঁর গভীর আগ্রহ ছিল। সেই আগ্রহ পরবর্তী সময়ে তাঁকে নিয়ে যায় বিজ্ঞানের উচ্চশিক্ষা এবং গবেষণার জগতে।
বিশাখাপত্তনমের এভিএন কলেজে পড়াশোনার সময়ই তাঁর মেধার পরিচয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ১৯৪৫ সালে পদার্থবিদ্যায় তিনি স্বর্ণপদক অর্জন করেন। সেই সময় একজন নারী শিক্ষার্থীর পক্ষে বিজ্ঞান বিষয়ে উচ্চশিক্ষা এবং গবেষণার ক্ষেত্রে এগিয়ে যাওয়া আজকের তুলনায় অনেক বেশি কঠিন ছিল।
কিন্তু প্রতিকূলতা তাঁর পথ আটকে রাখতে পারেনি। উচ্চশিক্ষার জন্য তিনি অন্ধ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান কলেজে পদার্থবিদ্যা নিয়ে পড়াশোনা শুরু করেন। ধীরে ধীরে তাঁর আগ্রহ আরও গভীর হয় গবেষণার দিকে।
মাইক্রোওয়েভ স্পেকট্রোস্কপির মতো বিশেষায়িত ক্ষেত্রে তিনি ডিএসসি ডিগ্রি অর্জন করেন। পরমাণু ও অণুর বর্ণালী বিশ্লেষণ ছিল তাঁর গবেষণার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র।
বিজ্ঞানের জটিল বিষয়কে শুধু পাঠ্যসূচির মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে তার গভীরে প্রবেশ করার প্রবণতাই পরবর্তীকালে তাঁর শিক্ষকতা ও গবেষণাজীবনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হয়ে ওঠে।
১৯৫৬ সালে শুরু শিক্ষকতার দীর্ঘ অধ্যায়
১৯৫৬ সাল। অন্ধ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের কলেজ অব সায়েন্সে পদার্থবিদ্যার প্রভাষক হিসেবে শিক্ষকতার জগতে প্রবেশ করেন সন্তাম্মা।
সেই সময় থেকে শুরু হয় তাঁর দীর্ঘ কর্মযাত্রা। শ্রেণিকক্ষে পাঠদান এবং গবেষণা—দুই ক্ষেত্রেই তিনি সমান গুরুত্ব দেন। বছরের পর বছর ধরে শিক্ষার্থীদের বিজ্ঞান শেখানোর পাশাপাশি নিজেও গবেষণার সঙ্গে যুক্ত থাকেন।
তাঁর গবেষণার মূল আগ্রহের একটি বড় ক্ষেত্র ছিল পরমাণু ও অণুর বর্ণালী বিশ্লেষণ। স্পেকট্রোস্কপির মাধ্যমে পদার্থের বৈশিষ্ট্য বোঝার এই গবেষণা আধুনিক পদার্থবিদ্যার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি গবেষণায় নিজেকে সক্রিয় রাখার ফলে তাঁর একাডেমিক পরিচিতিও ক্রমশ বিস্তৃত হয়।
প্রায় ৩৩ বছর অন্ধ্র বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করার পর ১৯৮৯ সালে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে অবসর নেন। কিন্তু এখানেই তাঁর কর্মজীবনের সমাপ্তি ঘটেনি।
অন্যদের কাছে অবসর যেখানে একটি দীর্ঘ কর্মজীবনের শেষ অধ্যায়, সন্তাম্মার কাছে সেটি যেন নতুন অধ্যায়ের সূচনা।
অবসরের পরেও শ্রেণিকক্ষ ছাড়েননি
১৯৮৯ সালের পরেও বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক বজায় থাকে। সম্মানীয় শিক্ষক হিসেবে তিনি শিক্ষাদানের সঙ্গে যুক্ত থাকেন।
অবসর নেওয়ার পর অনেক শিক্ষকই ধীরে ধীরে একাডেমিক জীবনের বাইরে চলে যান। কিন্তু সন্তাম্মা সেই প্রচলিত পথ বেছে নেননি। বরং তাঁর কাছে অবসরের অর্থ ছিল নিয়মিত চাকরির দায়িত্ব থেকে মুক্তি, জ্ঞানচর্চা থেকে নয়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে তাঁর দীর্ঘ সম্পর্ক তাঁকে শিক্ষার্থীদের কাছে একটি বিশেষ পরিচিত মুখ করে তোলে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম শিক্ষার্থী তাঁর কাছ থেকে পদার্থবিদ্যার পাঠ নিয়েছেন।
শিক্ষক হিসেবে তাঁর সাফল্যের সবচেয়ে বড় প্রমাণ তাঁর গবেষক-শিক্ষার্থীরা। তাঁর নির্দেশনায় ১৭ জন গবেষক পিএইচডি সম্পন্ন করেছেন। আরও চারজন তাঁর তত্ত্বাবধানে এমফিল সম্পূর্ণ করেছেন।
একজন শিক্ষকের প্রকৃত প্রভাব শুধু কতজন ছাত্র তাঁর ক্লাস করেছে তা দিয়ে মাপা যায় না। তাঁর ছাত্রছাত্রীরা পরবর্তী জীবনে কীভাবে জ্ঞানকে কাজে লাগিয়েছে, কতজন গবেষণায় এগিয়েছে, কতজন অন্যকে শিক্ষা দিয়েছে—সেখানেই একজন শিক্ষকের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ধরা পড়ে।
সন্তাম্মার ক্ষেত্রে সেই প্রভাবের পরিমাণ যথেষ্ট উল্লেখযোগ্য।
আন্তর্জাতিক গবেষণার অভিজ্ঞতাও রয়েছে
শুধু দেশীয় শিক্ষা ও গবেষণার পরিসরে সীমাবদ্ধ থাকেননি সন্তাম্মা। আন্তর্জাতিক স্তরেও তাঁর গবেষণার অভিজ্ঞতা রয়েছে।
১৯৭৮-৭৯ সালে তিনি আমেরিকার ওহাইও স্টেট বিশ্ববিদ্যালয়ে ফুলব্রাইট ভিজিটিং স্কলার হিসেবে কাজ করেন। সেই সময় আন্তর্জাতিক গবেষণা পরিবেশের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পান তিনি।
একজন ভারতীয় নারী বিজ্ঞানী হিসেবে সেই সময় বিদেশে গিয়ে গবেষণা করা তাঁর একাডেমিক জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। আন্তর্জাতিক পরিসরে গবেষণা করার অভিজ্ঞতা তাঁর বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গিকে আরও সমৃদ্ধ করে।
ফুলব্রাইটের মতো মর্যাদাপূর্ণ গবেষণা কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া তাঁর দীর্ঘ একাডেমিক যাত্রার অন্যতম উল্লেখযোগ্য স্বীকৃতি হিসেবেও বিবেচিত হয়।
গবেষণাগার থেকে শ্রেণিকক্ষ—দুই জায়গাতেই সক্রিয়
সন্তাম্মার জীবনের বিশেষত্ব হল, তিনি কখনও শিক্ষকতা এবং গবেষণাকে পরস্পরের থেকে আলাদা করে দেখেননি।
শিক্ষার্থীদের পড়িয়েছেন, আবার নিজেও গবেষণা করেছেন। গবেষণার অভিজ্ঞতা শ্রেণিকক্ষে কাজে লাগিয়েছেন এবং শিক্ষার্থীদের মধ্যে বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধিৎসা তৈরি করার চেষ্টা করেছেন।
তাঁর গবেষণার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল পরমাণু ও অণুর বর্ণালী বিশ্লেষণ। বিজ্ঞান শিক্ষায় এই ধরনের গবেষণা শুধু তাত্ত্বিক জ্ঞান নয়, পর্যবেক্ষণ, বিশ্লেষণ এবং যুক্তিভিত্তিক চিন্তাভাবনার গুরুত্বও সামনে নিয়ে আসে।
৯৬ বছর বয়সেও তিনি গবেষণার কাজের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বলে জানা যায়। গ্রুপ থিওরি নিয়ে একটি গবেষণাপত্র তৈরির কাজেও তিনি যুক্ত ছিলেন।
এই ঘটনা তাঁর মানসিক সক্রিয়তার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরে। বয়স বাড়লেও নতুন বিষয় নিয়ে চিন্তা করা, গবেষণা করা এবং বৈজ্ঞানিক আলোচনায় অংশ নেওয়ার আগ্রহ তাঁর মধ্যে অটুট ছিল।
পদার্থবিদ্যার বাইরেও বিস্তৃত তাঁর জ্ঞানের জগৎ
চিলুকুরি সন্তাম্মার জ্ঞানচর্চা কেবল বিজ্ঞানেই সীমাবদ্ধ নয়। ভারতীয় জ্ঞান-পরম্পরার বিভিন্ন দিক নিয়েও তাঁর গভীর আগ্রহ রয়েছে।
বেদ, উপনিষদ, পুরাণ, বৈদিক গণিত এবং ভারতীয় দর্শনের নানা বিষয় নিয়ে তিনি কাজ করেছেন। অর্থাৎ আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রাচীন ভারতীয় জ্ঞানধারাকে নিজের অধ্যয়নক্ষেত্রে পাশাপাশি রেখেছেন।
তিনি ‘ভগবদ্গীতা—দ্য ডিভাইন ডিরেক্টিভ’ নামে একটি বইও লিখেছেন। এই কাজের মাধ্যমে তাঁর আগ্রহের বহুমাত্রিকতা স্পষ্ট হয়।
বৈদিক গণিত নিয়েও তিনি সাত খণ্ডের একটি বৃহৎ প্রকাশনা প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
একদিকে পরমাণু ও অণুর বর্ণালী বিশ্লেষণের মতো আধুনিক বৈজ্ঞানিক গবেষণা, অন্যদিকে বেদ-উপনিষদ এবং বৈদিক গণিত—দুটি ভিন্ন জ্ঞানজগতের মধ্যে নিজের অনুসন্ধান চালিয়ে যাওয়ার মধ্যেই সন্তাম্মার বৌদ্ধিক পরিচয়ের বিশেষত্ব ফুটে ওঠে।
প্রাক্তন ছাত্রের আমন্ত্রণে নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ে
দীর্ঘ সময় অন্ধ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যুক্ত থাকার পর তাঁর এক প্রাক্তন ছাত্র অধ্যাপক জিএসএন রাজুর আমন্ত্রণে তিনি সেঞ্চুরিয়ন বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গেও যুক্ত হন।
সেখানে তাঁর ভূমিকা শুধু পদার্থবিদ্যার পাঠদানের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। মেডিক্যাল ফিজিক্স, রেডিওলজি এবং অ্যানেস্থেশিয়ার মতো বিষয়েও শিক্ষাদানের সঙ্গে তিনি যুক্ত ছিলেন।
এখানেও তাঁর বহুমুখী জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার ব্যবহার দেখা যায়।
একজন পদার্থবিদ্যার অধ্যাপিকা কীভাবে চিকিৎসাবিজ্ঞানের সঙ্গে সম্পর্কিত বিষয়েও শিক্ষাদানে ভূমিকা রাখতে পারেন, সন্তাম্মার কর্মজীবন তার একটি দৃষ্টান্ত।
বয়সের সঙ্গে শরীর দুর্বল হয়েছে, মন নয়
৯৭ বছর বয়সে পৌঁছনোর সঙ্গে সঙ্গে শারীরিক সমস্যাও তাঁর জীবনে এসেছে। হাঁটুর অস্ত্রোপচার করতে হয়েছে। অস্ত্রোপচারের পর চলাফেরার জন্য লাঠির সাহায্য নিতে হয়েছে।
কিন্তু শারীরিক অসুবিধা তাঁকে বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়া থেকে বিরত করতে পারেনি।
তাঁর দৈনিক যাতায়াতের দূরত্ব নিয়েও বিভিন্ন সময়ে বিস্ময় প্রকাশ করা হয়েছে। কোথাও একদিকে প্রায় ৬০ কিলোমিটার, কোথাও মোট যাতায়াত প্রায় ১৫০ কিলোমিটার পর্যন্ত উল্লেখ করা হয়েছে।
অর্থাৎ বয়স এবং শারীরিক সীমাবদ্ধতার মধ্যেও তিনি দীর্ঘ পথ অতিক্রম করে শিক্ষাদানের জায়গায় পৌঁছেছেন।
এই ঘটনা শুধু শারীরিক সহনশীলতার উদাহরণ নয়। বরং এটি প্রমাণ করে, কোনও কাজের প্রতি গভীর ভালোবাসা থাকলে মানুষ অনেক সময় নিজের সীমাবদ্ধতার সঙ্গেও নতুনভাবে লড়াই করার শক্তি খুঁজে পায়।
নিজের বাড়িও দান করলেন চিকিৎসার কাজে
সন্তাম্মার জীবনের আর একটি ঘটনা তাঁকে অনন্য করে তোলে। বিশাখাপত্তনমে তাঁর নিজের বাড়িটি তিনি চিকিৎসা পরিষেবার কাজে ব্যবহারের জন্য বিবেকানন্দ মেডিক্যাল ট্রাস্টকে দান করেছেন।
২০২৫ সালের একটি প্রতিবেদনে বাড়িটির আনুমানিক মূল্য প্রায় ১০ কোটি টাকা বলে উল্লেখ করা হয়েছিল।
নিজের জীবনের সঞ্চয় ও সম্পত্তিকে কেবল ব্যক্তিগত স্বার্থে ব্যবহার না করে মানুষের চিকিৎসার কাজে দান করার সিদ্ধান্ত তাঁর সামাজিক দায়বদ্ধতার পরিচয় বহন করে।
একজন শিক্ষকের জীবনে জ্ঞানদান যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনই সমাজের জন্য কিছু রেখে যাওয়ার ইচ্ছাও গুরুত্বপূর্ণ। সন্তাম্মার এই সিদ্ধান্ত সেই বৃহত্তর মানবিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয় দেয়।
শিক্ষকতা তাঁর কাছে চাকরি নয়, জীবনদর্শন
সন্তাম্মার জীবনকে যদি একটি বাক্যে ব্যাখ্যা করতে হয়, তাহলে বলা যায়—তিনি শিক্ষকতাকে পেশার সীমারেখায় আটকে রাখেননি।
১৯৫৬ সালে যখন তিনি প্রভাষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেছিলেন, তখন হয়তো কেউ ভাবেননি যে কয়েক দশক পরে বয়স তাঁকে থামাতে পারবে না।
১৯৮৯ সালে অবসর নেওয়ার পরও তিনি শিক্ষার্থীদের সঙ্গে যুক্ত থেকেছেন। গবেষণার কাজ করেছেন। নতুন বিষয় নিয়ে পড়াশোনা করেছেন। নিজের প্রাক্তন ছাত্রদের সঙ্গে যোগাযোগ রেখেছেন। নতুন বিশ্ববিদ্যালয়েও পড়িয়েছেন।
এমনকি ৯৬ বছর বয়সেও গবেষণাপত্র তৈরির কাজে যুক্ত থাকা তাঁর মানসিক সক্রিয়তার অসাধারণ উদাহরণ।
৯৭ বছর বয়সে বিশ্ববিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষে উপস্থিত হওয়া তাই কোনও বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এটি তাঁর দীর্ঘ জীবনের ধারাবাহিকতারই অংশ।
প্রজন্মের পর প্রজন্মের কাছে অনুপ্রেরণা
চিলুকুরি সন্তাম্মার কাহিনি শুধু প্রবীণদের জন্য নয়। তরুণ প্রজন্মের কাছেও তাঁর জীবন একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা বহন করে।
বর্তমান সময়ে অনেক ক্ষেত্রেই দ্রুত সাফল্য পাওয়ার প্রবণতা দেখা যায়। পড়াশোনা, চাকরি কিংবা গবেষণা—সব ক্ষেত্রেই মানুষ দ্রুত ফলাফল চায়।
সন্তাম্মার জীবন তার সম্পূর্ণ বিপরীত একটি বার্তা দেয়। কয়েক দশক ধরে একই সঙ্গে শেখা, শেখানো এবং গবেষণার মধ্য দিয়ে তিনি নিজের পরিচয় তৈরি করেছেন।
তিনি দেখিয়েছেন, প্রকৃত জ্ঞানচর্চার কোনও শেষ বয়স নেই। নতুন কিছু শেখার জন্য বয়স কোনও বাধা নয়। নিজের অভিজ্ঞতা পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ারও কোনও অবসরের বয়স নেই।
১৭ জন পিএইচডি গবেষক এবং চারজন এমফিল গবেষক তাঁর শিক্ষকতার উত্তরাধিকার বহন করছেন। তাঁরা নিজেরা যখন অন্য শিক্ষার্থী ও গবেষকদের শিক্ষা দেন, তখন সন্তাম্মার জ্ঞানের প্রভাব আরও বিস্তৃত হয়ে যায়।
একজন শিক্ষক এভাবেই নিজের জীবনকালকে অতিক্রম করে বেঁচে থাকেন তাঁর ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে।
বিজ্ঞান ও ভারতীয় জ্ঞানচর্চার সেতুবন্ধন
সন্তাম্মার জীবনকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলেছে তাঁর বহুমুখী জ্ঞানচর্চা।
একদিকে আধুনিক পদার্থবিদ্যা, স্পেকট্রোস্কপি এবং গবেষণা; অন্যদিকে বেদ, উপনিষদ, পুরাণ, ভগবদ্গীতা এবং বৈদিক গণিত।
জ্ঞানকে আলাদা আলাদা বাক্সে বন্দি না করে বিভিন্ন শাখার মধ্যে নিজের অনুসন্ধান চালানো তাঁর কাজের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য।
এই বহুমাত্রিক আগ্রহ আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে জ্ঞানচর্চার ক্ষেত্র যত বিস্তৃত হয়, চিন্তার জগতও তত সমৃদ্ধ হয়।
পদার্থবিদ্যার মতো নির্দিষ্ট ও কঠিন একটি বিষয়ে দীর্ঘ গবেষণা করার পাশাপাশি দর্শন ও প্রাচীন ভারতীয় জ্ঞানব্যবস্থা নিয়ে কাজ করা তাঁর মানসিক কৌতূহলেরই বহিঃপ্রকাশ।
অবসর শব্দটির নতুন অর্থ
‘অবসর’ শব্দটি সাধারণত কর্মজীবনের সমাপ্তির সঙ্গে যুক্ত। একটি নির্দিষ্ট বয়সে পৌঁছে মানুষ নিয়মিত চাকরি ছেড়ে দেন। তারপর শুরু হয় বিশ্রাম, পরিবার এবং ব্যক্তিগত জীবনের নতুন অধ্যায়।
কিন্তু চিলুকুরি সন্তাম্মার জীবন এই প্রচলিত ধারণাকে অন্যভাবে দেখতে শেখায়।
১৯৮৯ সালে তাঁর আনুষ্ঠানিক অবসর হয়েছিল। কিন্তু তাঁর শেখা বন্ধ হয়নি। পড়ানো বন্ধ হয়নি। গবেষণা বন্ধ হয়নি।
বরং বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তাঁর জীবন যেন আরও বেশি করে জ্ঞানচর্চার দিকে এগিয়েছে।
এই কারণেই তাঁর কাছে অবসর মানে থেমে যাওয়া নয়। বরং জীবনের নিয়মিত চাকরির কাঠামো থেকে বেরিয়ে এসে নিজের পছন্দের কাজকে আরও বেশি সময় দেওয়া।
৯৭ বছরের জীবনে একাধিক পরিচয়
চিলুকুরি সন্তাম্মাকে শুধু ‘৯৭ বছরের অধ্যাপিকা’ বলে পরিচয় করিয়ে দেওয়া তাঁর জীবনের বিশাল পরিসরকে ছোট করে দেখার মতো হবে।
তিনি একাধারে পদার্থবিদ, শিক্ষক, গবেষক, লেখক এবং জ্ঞানসন্ধানী। তাঁর জীবনে রয়েছে আন্তর্জাতিক গবেষণার অভিজ্ঞতা, দীর্ঘ শিক্ষকতা, অসংখ্য গবেষকের পথপ্রদর্শনের ইতিহাস এবং সমাজের জন্য সম্পত্তি দানের মতো মানবিক উদ্যোগ।
তাঁর কর্মজীবনের সবচেয়ে বড় শক্তি সম্ভবত ধারাবাহিকতা। কোনও একটি সময়ে বড় সাফল্য অর্জন করে থেমে যাননি। বরং বছরের পর বছর নিজের কাজের সঙ্গে যুক্ত থেকেছেন।
শারীরিক অসুবিধা এসেছে, বয়স বেড়েছে, অবসর এসেছে—কিন্তু জ্ঞানচর্চার প্রতি তাঁর আগ্রহ একইভাবে বহমান থেকেছে।
নতুন প্রজন্মের জন্য বড় বার্তা
চিলুকুরি সন্তাম্মার জীবন থেকে তরুণ প্রজন্ম কী শিখতে পারে?
প্রথমত, বয়স কখনও শেখার পথে চূড়ান্ত বাধা নয়।
দ্বিতীয়ত, একটি পেশাকে ভালোবাসলে সেটি কেবল জীবিকা থাকে না; তা জীবনদর্শনের অংশ হয়ে উঠতে পারে।
তৃতীয়ত, গবেষণা মানে শুধু পরীক্ষাগারে কাজ করা নয়। প্রশ্ন করার মানসিকতা, নতুন কিছু জানার আগ্রহ এবং নিজের জ্ঞান অন্যের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়াও গবেষণামনস্কতার অংশ।
চতুর্থত, সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা একজন শিক্ষিত মানুষের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হতে পারে। নিজের বাড়ি চিকিৎসার কাজে দান করার সিদ্ধান্ত তারই উদাহরণ।
সবচেয়ে বড় কথা, জীবন যত দীর্ঘ হয়, শেখার সম্ভাবনাও তত দীর্ঘ হতে পারে—যদি কৌতূহল বেঁচে থাকে।
সময়ের কাছে হার না মানা এক জীবন
৯৭ বছরের চিলুকুরি সন্তাম্মার জীবন তাই বয়সের সঙ্গে লড়াইয়ের গল্প নয়; এটি সময়কে অর্থপূর্ণভাবে ব্যবহার করার গল্প।
ভোররাত ৩টেয় ঘুম থেকে ওঠা থেকে শুরু করে নিজের খাবার তৈরি করা, দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে পৌঁছনো, শ্রেণিকক্ষে পড়ানো, গবেষণার সঙ্গে যুক্ত থাকা—প্রতিটি কাজের মধ্যেই রয়েছে একটি অভিন্ন সূত্র। সেই সূত্রের নাম দায়িত্ববোধ এবং জ্ঞানপিপাসা।
১৯৫৬ সালে যে পথচলা শুরু হয়েছিল, তা ১৯৮৯ সালের অবসরে থামেনি। ৯৬ বছরেও গবেষণার কাজ চলেছে, ৯৭ বছরেও শ্রেণিকক্ষের সঙ্গে সম্পর্ক অটুট রয়েছে।
এক শতাব্দীর কাছাকাছি জীবনে তিনি দেখিয়েছেন, মানুষের কর্মক্ষমতার সবচেয়ে বড় চালিকাশক্তি সবসময় শরীর নয়। অনেক সময় মনের ইচ্ছাই শরীরকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যায়।
চিলুকুরি সন্তাম্মার জীবনের সবচেয়ে বড় পরিচয় তাই তাঁর বয়স নয়। তাঁর সবচেয়ে বড় পরিচয়—তিনি এখনও শিখছেন, এখনও শেখাচ্ছেন এবং এখনও বিশ্বাস করেন জ্ঞানের যাত্রার কোনও শেষ নেই।
শেষ কথা
সময়ের সঙ্গে মানুষ বদলায়, জীবনের দায়িত্ব বদলায়, শরীরের শক্তি কমে আসে। কিন্তু কিছু মানুষের কাছে জ্ঞানচর্চার আকাঙ্ক্ষা বয়সের সঙ্গে কমে না; বরং আরও গভীর হয়। চিলুকুরি সন্তাম্মা সেই বিরল মানুষের একজন।
৯৭ বছর বয়সে বিশ্ববিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষে তাঁর উপস্থিতি একটি প্রতীকী ছবি তৈরি করে—একদিকে জীবনের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা, অন্যদিকে নতুন প্রজন্মের কৌতূহলী চোখ। শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীর এই সম্পর্কের কোনও বয়সসীমা নেই।
তাঁর জীবনের দিকে তাকালে একটি কথাই মনে হয়—অবসর নেওয়া যায় চাকরি থেকে, কিন্তু জ্ঞান থেকে নয়। ক্লাস শেষ হতে পারে, কিন্তু শেখার পাঠ শেষ হয় না। আর সত্যিকারের শিক্ষক কখনও অবসর নেন না; তাঁর শিক্ষা ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে, তাঁর গবেষণায় এবং তাঁর আদর্শে বহুদিন ধরে বেঁচে থাকে।
চিলুকুরি সন্তাম্মার ৯৭ বছরের জীবন সেই সত্যেরই এক উজ্জ্বল উদাহরণ।
আরও পড়ুন:IPF world championship:৪৫ কেজি শরীর, ১৪০ কেজির ডেডলিফ্ট!!! কিয়া বানার্জির অনন্য বিশ্বজয়ের গল্প!!!








