ডিজিটাল প্রযুক্তির হাত ধরে পর্যটনের নতুন দিগন্ত, শান্তিনিকেতনে অনুষ্ঠিত ‘একদুনিয়া ডিজিটাল ট্যুরিজম কনক্লেভ ২০২৬’
পর্যটন মানেই শুধুমাত্র কোনও নতুন শহর, পাহাড়, সমুদ্র কিংবা ঐতিহাসিক স্থানে কয়েক দিনের জন্য ঘুরতে যাওয়া নয়। একটি এলাকার মাটি, ইতিহাস, সংস্কৃতি, লোকজ ঐতিহ্য, প্রকৃতি, মানুষের জীবনযাপন এবং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা গল্পের সঙ্গে পরিচিত হওয়াও পর্যটনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। আর সেই পর্যটন-অভিজ্ঞতাকে আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে আরও সহজ, দ্রুত ও বিশ্বব্যাপী মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যেই রবিবার শান্তিনিকেতন মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের সভাকক্ষে অনুষ্ঠিত হল ‘একদুনিয়া ডিজিটাল ট্যুরিজম কনক্লেভ ২০২৬’।
‘অন্ত্যোদয় ডিজিটাল মিশন’-এর উদ্যোগে এবং ‘একদুনিয়া ডিজিটাল ট্যুরিজম’-এর আয়োজনে অনুষ্ঠিত এই কনক্লেভে পর্যটন শিল্পের সঙ্গে ডিজিটাল প্রযুক্তির ক্রমবর্ধমান সম্পর্ক, গ্রামীণ ও অফবিট পর্যটনের সম্ভাবনা, স্থানীয় মানুষের অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন এবং দেশের অজানা পর্যটনস্থলগুলিকে বিশ্বের সামনে তুলে ধরার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলি বিশেষ গুরুত্ব পায়।
পর্যটনের সংজ্ঞায় নতুন পরিবর্তন
এক সময় পর্যটন বলতে মূলত পরিচিত কোনও দর্শনীয় স্থানে গিয়ে সেখানকার সৌন্দর্য উপভোগ করাকেই বোঝানো হত। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই ধারণায় এসেছে ব্যাপক পরিবর্তন। এখন একজন পর্যটক শুধু বড় শহর বা জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্রেই যেতে চান না। অনেকেই খুঁজছেন এমন জায়গা, যেখানে রয়েছে স্বতন্ত্র সংস্কৃতি, স্থানীয় মানুষের জীবনধারা, প্রাকৃতিক বৈচিত্র্য, লোকশিল্প, ঐতিহ্যবাহী খাবার কিংবা ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা কোনও বিশেষ গল্প।
এই পরিবর্তিত পর্যটন-চাহিদার সঙ্গে তাল মিলিয়েই সামনে এসেছে ডিজিটাল পর্যটনের ধারণা। একটি মোবাইল ফোন, ইন্টারনেট সংযোগ এবং সঠিক ডিজিটাল উপস্থাপনা আজ কোনও অচেনা জায়গাকেও বহু মানুষের কাছে পরিচিত করে তুলতে পারে।
কনক্লেভের আলোচনায় উঠে আসে, কোনও পর্যটক একটি নতুন জায়গায় যাওয়ার পরিকল্পনা করার আগেই সাধারণত সেই জায়গা সম্পর্কে অনলাইনে তথ্য খোঁজেন। ছবি, ভিডিও, রাস্তার অবস্থান, যাতায়াতের ব্যবস্থা, থাকার জায়গা, স্থানীয় খাবার, দর্শনীয় স্থান, আবহাওয়া এবং অন্যান্য তথ্য তাঁর সিদ্ধান্ত গ্রহণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ফলে পর্যটন শিল্পের প্রচার ও প্রসারে ডিজিটাল মাধ্যমের গুরুত্ব এখন আর অস্বীকার করার সুযোগ নেই।
ডিজিটাল মাধ্যমই হতে পারে নতুন পর্যটন মানচিত্র
বর্তমান সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ভিডিও প্ল্যাটফর্ম, ওয়েবসাইট, ডিজিটাল মানচিত্র এবং বিভিন্ন অনলাইন পরিষেবা পর্যটন প্রচারের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হয়ে উঠেছে। একটি সুন্দর ছবি কিংবা কয়েক মিনিটের একটি ভিডিও কোনও এলাকার পর্যটন সম্ভাবনাকে মুহূর্তের মধ্যে বহু মানুষের সামনে তুলে ধরতে পারে।
বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গের মতো বৈচিত্র্যময় রাজ্যে এই সুযোগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দার্জিলিং, দীঘা, সুন্দরবন বা শান্তিনিকেতনের মতো বহুল পরিচিত পর্যটনকেন্দ্রের পাশাপাশি রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে রয়েছে বহু ছোট ও অচেনা গন্তব্য। কোথাও রয়েছে প্রাচীন স্থাপত্য, কোথাও নদী ও বনভূমির সৌন্দর্য, আবার কোথাও রয়েছে গ্রামীণ সংস্কৃতি, লোকসংগীত, মৃৎশিল্প, তাঁতশিল্প কিংবা ঐতিহ্যবাহী খাবার।
এই সমস্ত সম্পদকে পরিকল্পিতভাবে ডিজিটাল মাধ্যমে তুলে ধরা গেলে পর্যটনের পরিধি আরও বিস্তৃত হতে পারে। শুধু পর্যটকের সংখ্যা বাড়ানো নয়, এর মাধ্যমে স্থানীয় অর্থনীতিতেও নতুন গতি আসার সম্ভাবনা রয়েছে।
‘অন্ত্যোদয়’-এর ভাবনার সঙ্গে ডিজিটাল পর্যটনের যোগসূত্র
অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে ‘অন্ত্যোদয় ডিজিটাল মিশন’-এর স্রষ্টা মলয় পীট পর্যটনকে একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে তুলে ধরেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, পর্যটনের বিকাশ শুধু পর্যটনকেন্দ্রের সঙ্গে যুক্ত মানুষদের নয়, একটি বিস্তৃত এলাকার বহু মানুষের জীবন ও জীবিকার সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করে।
পর্যটক বাড়লে স্থানীয় পরিবহণ ব্যবস্থা, হোটেল ও আবাসন, রেস্তোরাঁ, ছোট দোকান, হস্তশিল্প, গাইড পরিষেবা এবং বিভিন্ন ধরনের ক্ষুদ্র ব্যবসার সুযোগ বাড়ে। অর্থাৎ একটি পর্যটনকেন্দ্রের উন্নয়ন পরোক্ষভাবে বহু মানুষের আয়ের পথ তৈরি করতে পারে।
মলয় পীট বলেন, তাঁদের কাজের সঙ্গে পণ্ডিত দীনদয়াল উপাধ্যায়ের ‘অন্ত্যোদয়’ ভাবনার গভীর মিল রয়েছে। সমাজের একেবারে প্রান্তে থাকা মানুষের উন্নয়নকে প্রকৃত উন্নয়নের অন্যতম মাপকাঠি হিসেবে দেখার যে দর্শন, ডিজিটাল প্রযুক্তির প্রসারের ক্ষেত্রেও সেই ভাবনাকে কাজে লাগানোর প্রয়োজন রয়েছে।
তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে, প্রযুক্তি যেন শুধুমাত্র শহর, বড় প্রতিষ্ঠান কিংবা সুবিধাপ্রাপ্ত মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে। প্রত্যন্ত এলাকার সাধারণ মানুষও যেন ডিজিটাল পরিষেবার সুবিধা পান এবং নিজেদের এলাকার সম্ভাবনাকে বৃহত্তর বিশ্বের সামনে তুলে ধরতে পারেন—এই লক্ষ্যেই ‘অন্ত্যোদয় ডিজিটাল মিশন’ কাজ করছে।
গ্রামবাংলার পর্যটনে রয়েছে বিপুল সম্ভাবনা
গ্রামীণ পর্যটনকে কনক্লেভের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে দেখা হয়। কারণ, গ্রামবাংলার নিজস্ব সংস্কৃতি ও জীবনযাত্রার মধ্যে এমন বহু উপাদান রয়েছে, যা শহুরে মানুষের কাছে আকর্ষণের বিষয় হতে পারে।
একটি গ্রামের মাটির বাড়ি, পুকুরপাড়, কৃষিজীবন, স্থানীয় মেলা, লোকগান, বাউলসংগীত, লোকনৃত্য, মৃৎশিল্প, তাঁত, কাঠের কাজ কিংবা কোনও বিশেষ খাবার—সবকিছুই পর্যটনের সম্পদ হতে পারে। কিন্তু এই সম্পদ সম্পর্কে বাইরের মানুষ জানেন না বলেই অনেক ক্ষেত্রেই পর্যটনের সুযোগ তৈরি হয় না।
ডিজিটাল প্রযুক্তি সেই ব্যবধান কমিয়ে দিতে পারে। স্থানীয় মানুষ নিজেরাই যদি তাঁদের এলাকার গল্প, সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্যকে ছবি, ভিডিও বা অন্যান্য ডিজিটাল মাধ্যমে তুলে ধরতে পারেন, তাহলে তা ধীরে ধীরে বৃহত্তর দর্শকের কাছে পৌঁছতে পারে।
এভাবে একটি ছোট গ্রামের পরিচিতি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সেখানে পর্যটকদের আনাগোনা বাড়তে পারে। পর্যটকদের জন্য বাড়িতে থাকার ব্যবস্থা, স্থানীয় খাবার পরিবেশন, গাইড পরিষেবা, হস্তশিল্প বিক্রি কিংবা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজনের মতো নতুন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড গড়ে উঠতে পারে।
অজানা পর্যটনকেন্দ্রের পরিচিতি বাড়ানোর সুযোগ
পর্যটনের ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন ধরে প্রচারের কেন্দ্রে ছিল কয়েকটি নির্দিষ্ট জনপ্রিয় স্থান। ফলে বহু সম্ভাবনাময় অঞ্চল পর্যটন মানচিত্রে সেভাবে জায়গা পায়নি। ডিজিটাল প্রযুক্তি সেই পরিস্থিতি বদলানোর সুযোগ তৈরি করেছে।
একটি অজানা এলাকার কয়েকটি আকর্ষণীয় ছবি, একটি তথ্যসমৃদ্ধ ভিডিও কিংবা স্থানীয় ইতিহাস নিয়ে তৈরি একটি ছোট প্রতিবেদনই মানুষের কৌতূহল তৈরি করতে পারে। পর্যটক যখন কোনও নতুন গন্তব্যের সম্পর্কে অনলাইনে ইতিবাচক তথ্য দেখতে পান, তখন সেই জায়গায় যাওয়ার আগ্রহও বাড়তে পারে।
তবে কনক্লেভের ভাবনায় শুধু প্রচার নয়, দায়িত্বশীল ডিজিটাল পর্যটনের কথাও গুরুত্বপূর্ণ। কোনও এলাকার প্রকৃতি, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে তুলে ধরার পাশাপাশি সেই এলাকার পরিবেশ ও সামাজিক ভারসাম্য রক্ষার বিষয়টিও গুরুত্ব পাওয়া জরুরি।
পর্যটন ও স্থানীয় অর্থনীতির সম্পর্ক
পর্যটন একটি বহুমুখী অর্থনৈতিক ক্ষেত্র। কোনও পর্যটক একটি জায়গায় গেলে শুধু একটি দর্শনীয় স্থান দেখেই ফিরে যান না। যাতায়াতের জন্য গাড়ি ব্যবহার করেন, খাবার খান, থাকার জায়গা নেন, স্থানীয় পণ্য কেনেন এবং বিভিন্ন পরিষেবা গ্রহণ করেন।
ফলে পর্যটকের ব্যয় সরাসরি ও পরোক্ষভাবে বহু মানুষের আয়ের উৎস হয়ে ওঠে। বিশেষ করে গ্রামীণ অঞ্চলে এই অর্থনৈতিক প্রভাব আরও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
একটি এলাকার স্থানীয় হস্তশিল্প যদি পর্যটকদের কাছে জনপ্রিয় হয়, তাহলে শিল্পীরা আরও বেশি পণ্য তৈরি করার সুযোগ পাবেন। ঐতিহ্যবাহী খাবারের চাহিদা বাড়লে স্থানীয়ভাবে সেই খাবারের সঙ্গে যুক্ত ব্যবসার প্রসার ঘটবে। একইভাবে স্থানীয় পরিবহণ ও থাকার ব্যবস্থারও উন্নতি হতে পারে।
এই কারণেই পর্যটনকে শুধুমাত্র বিনোদন বা ভ্রমণের বিষয় হিসেবে না দেখে স্থানীয় অর্থনৈতিক উন্নয়নের একটি সম্ভাবনাময় মাধ্যম হিসেবেও দেখা দরকার।
প্রযুক্তির মাধ্যমে পর্যটকের অভিজ্ঞতা আরও সহজ
ডিজিটাল পর্যটনের আরেকটি বড় সুবিধা হল পর্যটকের সময় ও পরিশ্রম কমানো। আগে কোনও জায়গা সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য পেতে পর্যটনবিষয়ক বই, পুস্তিকা বা পরিচিত মানুষের ওপর নির্ভর করতে হত। এখন মোবাইল ফোনেই কয়েক মুহূর্তের মধ্যে প্রয়োজনীয় তথ্য পাওয়া সম্ভব।
কোন পথে গেলে দ্রুত পৌঁছনো যাবে, কোথায় থাকা যায়, কোথায় স্থানীয় খাবার পাওয়া যায়, কোন সময়ে কোন দর্শনীয় স্থান খোলা থাকে কিংবা আশপাশে আর কী কী দেখার মতো জায়গা রয়েছে—এই ধরনের তথ্য পর্যটনের অভিজ্ঞতাকে অনেক বেশি পরিকল্পিত করে তুলতে পারে।
এর ফলে পর্যটক শুধু একটি নির্দিষ্ট স্থান দেখেই ফিরে না এসে আশপাশের আরও কয়েকটি আকর্ষণীয় জায়গা ঘুরে দেখতে পারেন। এতে একটি এলাকার পর্যটন অর্থনীতি আরও বিস্তৃত হতে পারে।
স্থানীয় সংস্কৃতিকে বিশ্বের সামনে তুলে ধরার সুযোগ
ডিজিটাল পর্যটনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলির একটি হল সাংস্কৃতিক সংরক্ষণ ও প্রচার। একটি অঞ্চলের লোকসংগীত, লোকনৃত্য, উৎসব, পোশাক, রান্না, শিল্পকলা এবং মানুষের জীবনযাপন ডিজিটাল মাধ্যমে নথিভুক্ত করা সম্ভব।
আজকের প্রজন্ম মোবাইল ফোনে ভিডিও দেখে নতুন জায়গা সম্পর্কে জানতে পারে। ফলে একটি এলাকার সাংস্কৃতিক পরিচয় যদি সুন্দর ও তথ্যসমৃদ্ধভাবে তুলে ধরা যায়, তা তরুণ প্রজন্মের কাছেও আকর্ষণীয় হয়ে উঠতে পারে।
একই সঙ্গে বিদেশি পর্যটকদের কাছেও স্থানীয় সংস্কৃতির পরিচয় পৌঁছে দেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। বাংলার বহু ঐতিহ্য এখনও দেশের বাইরের মানুষের কাছে অজানা। সঠিক ডিজিটাল প্রচারের মাধ্যমে সেই সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য আন্তর্জাতিক পর্যায়েও পরিচিতি পেতে পারে।
পর্যটনের সঙ্গে মানুষের ক্ষমতায়ন
কনক্লেভের আলোচনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা ছিল—পর্যটনের উন্নয়ন যেন শুধুমাত্র বড় ব্যবসা বা বড় প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে। স্থানীয় মানুষকে পর্যটন ব্যবস্থার সক্রিয় অংশীদার করা প্রয়োজন।
কোনও এলাকার মানুষ যদি নিজের এলাকার পর্যটনসম্পদ সম্পর্কে জানেন এবং ডিজিটাল মাধ্যমে তা তুলে ধরতে পারেন, তাহলে তাঁরা নিজেরাই পর্যটনের প্রচারক হয়ে উঠতে পারেন। এর ফলে বাইরের বিনিয়োগের পাশাপাশি স্থানীয় উদ্যোগও উৎসাহ পেতে পারে।
গ্রামের যুবক-যুবতীরা ডিজিটাল কনটেন্ট তৈরি, পর্যটন গাইড, অনলাইন প্রচার, ফটোগ্রাফি, ভিডিওগ্রাফি কিংবা ডিজিটাল পরিষেবার সঙ্গে যুক্ত হয়ে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ পেতে পারেন।
‘ডিজিটাল ইন্ডিয়া’-র ভাবনার সঙ্গে সংযোগ
ভারতের ডিজিটাল পরিবর্তনের সঙ্গে পর্যটন শিল্পের এই নতুন প্রবণতার একটি স্বাভাবিক সম্পর্ক রয়েছে। ডিজিটাল পরিষেবা যত সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছচ্ছে, ততই প্রত্যন্ত এলাকার মানুষও নিজেদের পরিচয় ও সম্ভাবনাকে বৃহত্তর পরিসরে তুলে ধরার সুযোগ পাচ্ছেন।
এই প্রেক্ষাপটে ‘অন্ত্যোদয় ডিজিটাল মিশন’-এর ভাবনা বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। প্রযুক্তির সুবিধা যেন সমাজের প্রতিটি স্তরে পৌঁছয় এবং ডিজিটাল মাধ্যম যেন মানুষের জীবনযাত্রার উন্নয়নে কার্যকর ভূমিকা নিতে পারে—এই লক্ষ্য পর্যটনের ক্ষেত্রেও নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে।
ভবিষ্যতের পর্যটন হবে আরও ডিজিটাল
আগামী দিনে পর্যটনের সঙ্গে প্রযুক্তির সম্পর্ক আরও গভীর হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ভার্চুয়াল ট্যুর, ডিজিটাল গাইড, অনলাইন বুকিং, স্মার্ট ম্যাপ, বহুভাষিক তথ্য, ডিজিটাল পেমেন্ট এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক তথ্য পরিষেবা পর্যটকদের অভিজ্ঞতাকে আরও সহজ করে তুলতে পারে।
তবে প্রযুক্তির ব্যবহার যত বাড়বে, তথ্যের নির্ভুলতা ও বিশ্বাসযোগ্যতার গুরুত্বও তত বাড়বে। কোনও পর্যটনকেন্দ্র সম্পর্কে ভুল তথ্য দিলে পর্যটকের অভিজ্ঞতা খারাপ হতে পারে। তাই ডিজিটাল পর্যটনের ক্ষেত্রে সঠিক তথ্য, স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণ এবং দায়িত্বশীল প্রচার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
একটি নতুন সম্ভাবনার দরজা
শান্তিনিকেতনে অনুষ্ঠিত ‘একদুনিয়া ডিজিটাল ট্যুরিজম কনক্লেভ ২০২৬’ তাই শুধুমাত্র একটি অনুষ্ঠান হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকেনি। এর মধ্য দিয়ে পর্যটনের ভবিষ্যৎ নিয়ে একটি বৃহত্তর ভাবনার দিকও সামনে এসেছে।
পর্যটন যদি ডিজিটাল প্রযুক্তির সাহায্যে আরও বেশি মানুষের কাছে পৌঁছয়, তবে শুধু পরিচিত গন্তব্য নয়, অজানা ও সম্ভাবনাময় বহু অঞ্চলও নতুন পরিচয় পেতে পারে। আর সেই পর্যটনের কেন্দ্রে যদি স্থানীয় মানুষ থাকেন, তাহলে পর্যটন হয়ে উঠতে পারে কর্মসংস্থান, সংস্কৃতি সংরক্ষণ এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের একটি শক্তিশালী মাধ্যম।
একটি গ্রামের গল্প, একজন কারিগরের শিল্প, একজন প্রবীণ মানুষের মুখে শোনা ইতিহাস, কোনও নদীর পাড়ের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য কিংবা বহুদিনের পুরনো লোকসংস্কৃতি—সবকিছুকেই ডিজিটাল প্রযুক্তি বৃহত্তর দর্শকের সামনে তুলে ধরতে পারে।
পর্যটনের ভবিষ্যৎ এখন শুধু রাস্তা, হোটেল কিংবা দর্শনীয় স্থানের উন্নয়নের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তথ্য, প্রযুক্তি, মানুষের অংশগ্রহণ এবং স্থানীয় সংস্কৃতির সঠিক উপস্থাপনাও পর্যটনের সাফল্যের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হয়ে উঠছে।
‘একদুনিয়া ডিজিটাল ট্যুরিজম কনক্লেভ ২০২৬’ সেই পরিবর্তনের কথাই নতুন করে সামনে আনল। এর মূল বার্তা স্পষ্ট—প্রযুক্তি যদি মানুষের কাছে পৌঁছতে পারে, তবে মানুষের নিজের এলাকার সম্ভাবনাও বিশ্বের কাছে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব।
বাংলার প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে দেশের বিভিন্ন অচেনা পর্যটনকেন্দ্র—প্রতিটি জায়গারই রয়েছে নিজস্ব গল্প। সেই গল্পকে সঠিকভাবে সংরক্ষণ, উপস্থাপন ও প্রচারের সুযোগ তৈরি করতে পারে ডিজিটাল প্রযুক্তি। পর্যটন তখন আর শুধু ভ্রমণ থাকবে না; হয়ে উঠবে মানুষের সঙ্গে মানুষের, সংস্কৃতির সঙ্গে সংস্কৃতির এবং স্থানীয় সম্ভাবনার সঙ্গে বিশ্ববাজারের এক নতুন সংযোগ।
এই দৃষ্টিভঙ্গিই ভবিষ্যতের পর্যটনকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক, প্রযুক্তিনির্ভর এবং মানুষের জীবনকেন্দ্রিক করে তুলতে পারে। আর সেই পথচলায় ‘একদুনিয়া ডিজিটাল ট্যুরিজম কনক্লেভ ২০২৬’ একটি গুরুত্বপূর্ণ ভাবনার সূচনা হিসেবে স্মরণীয় হয়ে থাকতে পারে।








