বাড়িতে মোবাইল নেটওয়ার্ক নেই, ছিল না নামী কোচিংয়ের সামর্থ্য—পাহাড়ে উঠে অনলাইন ক্লাস করে চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্নের পথে এগিয়ে গেলেন ময়ূরভঞ্জের যজ্ঞসেনী ও দিব্যসেনী
স্বপ্ন দেখতে কোনও খরচ হয় না। কিন্তু সেই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে গেলে অনেক সময় পেরোতে হয় কঠিন পথ, অতিক্রম করতে হয় একের পর এক বাধা। কারও কাছে সেই বাধা অর্থের অভাব, কারও কাছে পরিকাঠামোর সীমাবদ্ধতা, আবার কারও ক্ষেত্রে সুযোগের অসমতা। তবে ইচ্ছাশক্তি যদি অটুট থাকে, তাহলে প্রতিকূলতাও একসময় পথ ছেড়ে দেয়। ওড়িশার ময়ূরভঞ্জ জেলার প্রত্যন্ত মহুলপঙ্খা গ্রামের দুই বোন যজ্ঞসেনী খাতুয়া এবং দিব্যসেনী খাতুয়ার NEET 2026-এ সাফল্যের গল্প যেন সেই বাস্তবতারই জীবন্ত উদাহরণ।
চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে পথচলা শুরু করেছিলেন তাঁরা। কিন্তু তাঁদের সামনে ছিল না শহরের মতো উন্নত শিক্ষার পরিকাঠামো, ছিল না সহজে পাওয়া ইন্টারনেট পরিষেবা, ছিল না ব্যয়বহুল কোচিং সেন্টারে পড়ার আর্থিক সামর্থ্য। এমনকি অনলাইন ক্লাস করার জন্য প্রয়োজনীয় মোবাইল নেটওয়ার্কও তাঁদের বাড়ির ভিতরে ঠিকমতো পাওয়া যেত না।
তবু থেমে যাননি তাঁরা।
যেখানে অন্যদের কাছে অনলাইন ক্লাস ছিল ঘরে বসে পড়াশোনার একটি স্বাভাবিক মাধ্যম, সেখানে এই দুই বোনের কাছে অনলাইন ক্লাসে যোগ দেওয়াই ছিল একটি আলাদা লড়াই। ভালো মোবাইল সিগন্যালের সন্ধানে বাড়ির কাছাকাছি পাহাড়ি এলাকায় উঠে যেতে হত তাঁদের। সেই পাহাড়ের ঢাল বা উঁচু কোনও জায়গায় দাঁড়িয়ে মোবাইল হাতে শুরু হত ক্লাস। কখনও সিগন্যাল ঠিক থাকত, কখনও আবার সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যেত। কিন্তু পড়াশোনার প্রতি তাঁদের জেদ এতটাই প্রবল ছিল যে প্রযুক্তির এই প্রতিকূলতাও শেষ পর্যন্ত তাঁদের আটকাতে পারেনি।
আজ সেই সংগ্রামের ফল NEET 2026-এর সাফল্য।
বড় বোন যজ্ঞসেনী খাতুয়া তৃতীয় প্রচেষ্টায় পরীক্ষায় সফল হয়েছেন। অন্যদিকে ছোট বোন দিব্যসেনী খাতুয়া প্রথমবারের চেষ্টাতেই NEET উত্তীর্ণ হয়েছেন। দুই বোনের এই সাফল্য শুধু একটি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার ঘটনা নয়। এটি প্রত্যন্ত ভারতের শিক্ষার্থীদের জন্য আত্মবিশ্বাসের এক শক্তিশালী বার্তা। এটি প্রমাণ করে, বড় শহরের নামী কোচিং বা অত্যাধুনিক পড়াশোনার পরিবেশ না থাকলেও লক্ষ্য স্থির থাকলে সাফল্যের দরজা খোলা সম্ভব।
বাড়িতে নেটওয়ার্ক নেই, পাহাড়ই হয়ে উঠল ক্লাসরুম
ময়ূরভঞ্জ জেলার কাপ্তিপদা ব্লকের মাজিগড়িয়া পঞ্চায়েতের অন্তর্গত মহুলপঙ্খা গ্রাম। প্রকৃতির কাছাকাছি থাকা এই প্রত্যন্ত অঞ্চলের জীবনযাত্রা শহরের থেকে অনেকটাই আলাদা। যোগাযোগ, প্রযুক্তি এবং শিক্ষার সুযোগ—সব ক্ষেত্রেই রয়েছে নানা সীমাবদ্ধতা।
দুই বোনের চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন ছিল ছোট থেকেই। সেই স্বপ্নকে সামনে রেখে তাঁদের পড়াশোনায় অনলাইন শিক্ষার ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। কিন্তু বাড়িতে বসে অনলাইন ক্লাস করার মতো মোবাইল নেটওয়ার্ক ছিল না। সাধারণ পরিস্থিতিতে এই সমস্যাই হয়তো অনেক শিক্ষার্থীর পড়াশোনা থামিয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।
যজ্ঞসেনী ও দিব্যসেনীর ক্ষেত্রে ঘটনাটি ছিল সম্পূর্ণ উল্টো।
তাঁরা সমস্যাকে মেনে নেননি। বরং সমস্যার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার পথ খুঁজে নিয়েছেন। বাড়ির আশপাশের এমন পাহাড়ি জায়গা খুঁজে নিয়েছিলেন, যেখানে মোবাইল সিগন্যাল তুলনামূলক ভালো পাওয়া যায়। তারপর মোবাইল হাতে সেখানে উঠে যেতেন তাঁরা।
পাহাড়ের উপর বসেই কখনও অনলাইন ক্লাস, কখনও শিক্ষামূলক ভিডিও, কখনও পড়াশোনার অন্যান্য ডিজিটাল উপকরণ—এভাবেই চলেছে প্রস্তুতি।
একদিকে প্রকৃতির নির্জনতা, অন্যদিকে হাতে মোবাইল। সামনে চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন। সেই স্বপ্ন পূরণের লক্ষ্যে পাহাড়ের চূড়াই হয়ে উঠেছিল তাঁদের অস্থায়ী পড়ার ঘর।
এই দৃশ্য শুধু আবেগের নয়; এটি ভারতের ডিজিটাল শিক্ষাব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতাকেও সামনে আনে। প্রযুক্তি যতই শিক্ষার সুযোগ বাড়িয়ে দিক, তার সুবিধা পেতে গেলে ইন্টারনেট সংযোগ, বিদ্যুৎ, ডিভাইস এবং আর্থিক সামর্থ্যের মতো মৌলিক বিষয়গুলিও প্রয়োজন। প্রত্যন্ত এলাকার বহু শিক্ষার্থীর কাছে এই সুবিধাগুলি এখনও সহজলভ্য নয়।
যজ্ঞসেনী ও দিব্যসেনী সেই সীমাবদ্ধতার মধ্যেই নিজেদের পথ তৈরি করেছেন।
কোচিংয়ের সুযোগ ছিল না, আত্মপাঠই ছিল ভরসা
NEET-এর মতো প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতিতে অনেক শিক্ষার্থী দীর্ঘ সময় ধরে বিশেষায়িত কোচিং নেন। শহর ও বড় শিক্ষাকেন্দ্রগুলিতে বিভিন্ন ধরনের প্রশিক্ষণ, মক টেস্ট, ব্যক্তিগত গাইডেন্স এবং উন্নত শিক্ষাসামগ্রী পাওয়া যায়।
মহুলপঙ্খার এই দুই বোনের সামনে সেই সুযোগ ছিল না।
তাঁদের বাবা গৌরাঙ্গ খাতুয়া কৃষিকাজের সঙ্গে যুক্ত। মা সুনীতা খাতুয়া অঙ্গনওয়াড়ি সহায়িকা হিসেবে কাজ করেন। পরিবারের আর্থিক সামর্থ্য সীমিত। সেই পরিস্থিতিতে ব্যয়বহুল কোচিংয়ের পিছনে বড় অঙ্কের অর্থ খরচ করা সহজ ছিল না।
কিন্তু অর্থের সীমাবদ্ধতা তাঁদের লক্ষ্যকে ছোট করেনি।
নিজেদের পড়াশোনার পরিকল্পনা নিজেরাই তৈরি করেছেন তাঁরা। অনলাইন ক্লাস, বিভিন্ন শিক্ষাসামগ্রী, আত্মপাঠ এবং দুই বোনের পারস্পরিক আলোচনা হয়ে উঠেছিল প্রস্তুতির মূল ভিত্তি।
কোনও বিষয় বুঝতে সমস্যা হলে একে অপরের সঙ্গে আলোচনা করতেন। পড়া বিষয় নিয়ে নিজেদের মধ্যে প্রশ্নোত্তর করতেন। ভুল হলে তা সংশোধনের চেষ্টা করতেন। পরীক্ষার প্রস্তুতিতে যে বিষয়গুলি বেশি গুরুত্বপূর্ণ, সেগুলিকে বারবার অনুশীলন করতেন।
এইভাবে ধীরে ধীরে তৈরি হয়েছিল তাঁদের প্রস্তুতি।
শিক্ষাক্ষেত্রে একটি প্রচলিত ধারণা হল—ভালো ফলের জন্য উন্নত পরিকাঠামো দরকার। যজ্ঞসেনী ও দিব্যসেনীর গল্প অবশ্য অন্য একটি সত্য সামনে আনে। পরিকাঠামো গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু সেটিই সবকিছু নয়। শিক্ষার্থীর অধ্যবসায়, আত্মনিয়ন্ত্রণ, ধারাবাহিক অনুশীলন এবং পরিবারের সমর্থনও সাফল্যের বড় শক্তি হতে পারে।
বড় বোনের ব্যর্থতা হয়ে উঠল ছোট বোনের শিক্ষার অভিজ্ঞতা
দুই বোনের সাফল্যের গল্পের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হল তাঁদের পারস্পরিক সহযোগিতা।
যজ্ঞসেনী প্রথমবারেই থামেননি। NEET-এর লক্ষ্যে পৌঁছতে তাঁকে একাধিকবার চেষ্টা করতে হয়েছে। তৃতীয় প্রচেষ্টায় তিনি সাফল্য অর্জন করেন।
অন্যদিকে দিব্যসেনী প্রথমবারের চেষ্টাতেই NEET উত্তীর্ণ হন।
দুই বোনের প্রস্তুতির পথ আলাদা হলেও তাঁদের মধ্যে অভিজ্ঞতা ভাগ করে নেওয়ার সুযোগ ছিল। বড় বোনের আগের পরীক্ষার অভিজ্ঞতা ছোট বোনের প্রস্তুতিতে সহায়ক হয়েছে। কোন ধরনের প্রশ্নের জন্য কীভাবে প্রস্তুতি নিতে হয়, সময় ব্যবস্থাপনা কীভাবে করতে হয়, কোন বিষয়গুলিতে বেশি গুরুত্ব দিতে হয়—এই সমস্ত ক্ষেত্রেই যজ্ঞসেনীর অভিজ্ঞতা দিব্যসেনীর জন্য কার্যকর হয়ে ওঠে।
এখানেই তাঁদের সম্পর্কের আরেকটি সুন্দর দিক সামনে আসে।
প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতির সময় অনেকেই নিজের পড়াশোনা নিয়েই ব্যস্ত থাকেন। কিন্তু এই দুই বোন একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী না হয়ে সহযোগী হয়েছেন। একজনের অভিজ্ঞতা অন্যজনের পথকে সহজ করেছে।
যজ্ঞসেনীর প্রথম দিকের চেষ্টার অভিজ্ঞতা দিব্যসেনীর প্রস্তুতির ভিত শক্ত করেছে। আর দিব্যসেনীর সাফল্য বড় বোনের দীর্ঘ সংগ্রামকেও যেন নতুন অর্থ দিয়েছে।
দুই বোনের এই যাত্রায় তাই ব্যক্তিগত সাফল্যের পাশাপাশি রয়েছে পারিবারিক বন্ধনের এক অনন্য উদাহরণ।
পাহাড়ে পড়াশোনা—শুধু একটি ছবি নয়, এক বাস্তব সংগ্রাম
আজ তাঁদের সাফল্যের গল্প শুনলে পাহাড়ে উঠে অনলাইন ক্লাস করার বিষয়টি অনেকের কাছে অনুপ্রেরণামূলক মনে হতে পারে। কিন্তু বাস্তবে এটি ছিল প্রতিদিনের এক কঠিন অভ্যাস।
একজন শিক্ষার্থী যখন বাড়িতে বসে মোবাইল বা কম্পিউটারে ক্লাস করতে পারে, তখন তার পড়াশোনার জন্য সময় এবং পরিবেশ দুটোই তুলনামূলকভাবে সহজলভ্য। কিন্তু যজ্ঞসেনী ও দিব্যসেনীর ক্ষেত্রে প্রথম কাজই ছিল সিগন্যাল খুঁজে বের করা।
বাড়িতে নেটওয়ার্ক নেই—তাহলে কোথায় আছে?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজেই তাঁদের পাহাড়ের দিকে যেতে হত।
সিগন্যাল পাওয়া গেলেই শুরু হত ক্লাস। সংযোগ স্থির থাকলে ক্লাস চলত। সংযোগ দুর্বল হলে আবার অপেক্ষা। কখনও স্থান পরিবর্তন করতে হয়েছে। কখনও দীর্ঘ সময় পাহাড়ি এলাকায় থাকতে হয়েছে।
অর্থাৎ তাঁদের পড়াশোনার সঙ্গে জড়িয়ে ছিল অতিরিক্ত শারীরিক পরিশ্রমও।
শহরের একজন শিক্ষার্থীর কাছে যে কাজটি ছিল মাত্র একটি ক্লিকের দূরত্বে, প্রত্যন্ত গ্রামের এই দুই বোনের কাছে সেটিই ছিল দীর্ঘ পথ পেরিয়ে পাওয়া একটি সুযোগ।
এই পার্থক্যটি তাঁদের সাফল্যকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলেছে।
পরিবারের আস্থা ছিল সবচেয়ে বড় শক্তি
যেকোনও শিক্ষার্থীর সাফল্যের পিছনে পরিবার একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। যজ্ঞসেনী ও দিব্যসেনীর ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হয়নি।
গৌরাঙ্গ খাতুয়া কৃষিকাজ করেন। কৃষিনির্ভর পরিবারের আয় সবসময় নিশ্চিত নয়। প্রকৃতি, ফসল, বাজার—বিভিন্ন বিষয়ের উপর নির্ভর করে পরিবারের আর্থিক পরিস্থিতি পরিবর্তিত হতে পারে।
সুনীতা খাতুয়া অঙ্গনওয়াড়ি সহায়িকা হিসেবে কাজ করেন। সীমিত আয়ের মধ্যেও সন্তানদের পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছেন তাঁরা।
দামি কোচিংয়ের ব্যবস্থা করতে না পারলেও মেয়েদের স্বপ্নকে তাঁরা কখনও ছোট করে দেখেননি।
বরং তাঁদের পাশে থেকেছেন।
দুই মেয়ের চিকিৎসক হওয়ার আকাঙ্ক্ষায় বাবা-মায়ের আস্থা তাঁদের মানসিক শক্তি বাড়িয়েছে। আর সেই পারিবারিক সমর্থনই কঠিন সময়ে তাঁদের আবার পড়াশোনার টেবিলে ফিরিয়ে এনেছে।
একজন শিক্ষার্থীর কাছে পরিবারের এই বিশ্বাসের মূল্য অনেক। বিশেষ করে যখন আর্থিক বা পরিকাঠামোগত বাধা থাকে, তখন পরিবার যদি উৎসাহ দেয়, সেই উৎসাহই অনেক সময় শিক্ষার্থীর আত্মবিশ্বাস ধরে রাখে।
NEET সাফল্যের পিছনে লুকিয়ে রয়েছে বহু দিনের অধ্যবসায়
NEET পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশের দিনটি অবশ্যই আনন্দের। কিন্তু একটি ফলাফলের পিছনে থাকা মাসের পর মাসের পরিশ্রম চোখে দেখা যায় না।
যজ্ঞসেনী ও দিব্যসেনীর ক্ষেত্রেও তাই।
ভোরে উঠে পড়াশোনা, বিষয়ভিত্তিক প্রস্তুতি, অনলাইন ক্লাস, প্রশ্ন অনুশীলন, নিজেদের মধ্যে আলোচনা—সব মিলিয়ে তাঁদের দিন কেটেছে নিয়মিত পরিশ্রমের মধ্যে।
একদিকে ছিল পড়াশোনার চাপ, অন্যদিকে ছিল সীমিত সুযোগের বাস্তবতা।
কখনও প্রযুক্তিগত সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়েছে, কখনও অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা সামনে এসেছে। বড় বোনের ক্ষেত্রে একাধিকবার পরীক্ষায় বসার অভিজ্ঞতাও ছিল মানসিকভাবে কঠিন।
কিন্তু ব্যর্থতা তাঁকে থামাতে পারেনি।
প্রথমবার সাফল্য না এলেও লক্ষ্য বদলাননি তিনি। দ্বিতীয়বারও চেষ্টা করেছেন। অবশেষে তৃতীয় প্রচেষ্টায় সফল হয়েছেন।
এই অভিজ্ঞতা থেকে ছোট বোনও শিখেছেন—একটি ব্যর্থতা মানেই স্বপ্নের শেষ নয়।
বরং ব্যর্থতা কখনও কখনও সাফল্যের প্রস্তুতিকে আরও শক্তিশালী করে।
প্রত্যন্ত ভারতের শিক্ষার্থীদের জন্য বড় বার্তা
যজ্ঞসেনী ও দিব্যসেনীর গল্পকে শুধু ব্যক্তিগত সাফল্য হিসেবে দেখলে এর একটি বড় দিক অদৃশ্য থেকে যাবে।
ভারতের বিভিন্ন প্রত্যন্ত অঞ্চলে এখনও এমন বহু শিক্ষার্থী রয়েছে, যাদের প্রতিভা ও স্বপ্ন রয়েছে, কিন্তু সেই স্বপ্নের সঙ্গে তাল মিলিয়ে সুযোগ নেই। কোথাও ইন্টারনেট দুর্বল, কোথাও শিক্ষকের অভাব, কোথাও ভালো গ্রন্থাগার নেই, আবার কোথাও পরিবারের আর্থিক সামর্থ্য সীমিত।
এই বাস্তবতার মধ্যে যজ্ঞসেনী ও দিব্যসেনীর সাফল্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে।
সুযোগের ঘাটতি অবশ্যই একটি বাস্তব সমস্যা। কিন্তু সুযোগের অভাবকে অতিক্রম করার জন্য ব্যক্তিগত উদ্যোগ, পরিবার ও সমাজের সমর্থন এবং প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার একসঙ্গে বড় ভূমিকা নিতে পারে।
তাঁদের কাহিনি একই সঙ্গে সরকারের কাছে গ্রামীণ ডিজিটাল পরিকাঠামো উন্নয়নের প্রয়োজনীয়তার কথাও মনে করিয়ে দেয়।
একটি প্রত্যন্ত গ্রামের শিক্ষার্থী যদি শুধুমাত্র অনলাইন ক্লাস করার জন্য পাহাড়ে উঠতে বাধ্য হন, তাহলে সেই দৃশ্য একদিকে যেমন তাঁর সাহসের পরিচয়, অন্যদিকে তেমনই গ্রামীণ যোগাযোগ ও ইন্টারনেট ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতারও প্রতিচ্ছবি।
সাফল্যের পরেও লক্ষ্য আরও বড়
NEET উত্তীর্ণ হওয়া তাঁদের কাছে শেষ গন্তব্য নয়। বরং এটি একটি নতুন যাত্রার শুরু।
দুই বোনের স্বপ্ন ভবিষ্যতে চিকিৎসক হওয়া। তাঁরা মানুষের পাশে দাঁড়াতে চান। বিশেষ করে প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের স্বাস্থ্য পরিষেবার বাস্তবতা তাঁরা খুব কাছ থেকে দেখেছেন।
নিজেদের জীবনের অভিজ্ঞতা তাঁদের চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্নকে আরও অর্থবহ করে তুলেছে।
যে এলাকায় শিক্ষার জন্যই এতটা পথ পাড়ি দিতে হয়, সেখানে স্বাস্থ্য পরিষেবার চ্যালেঞ্জও যে কম নয়, তা তাঁরা জানেন। তাই ভবিষ্যতে চিকিৎসক হয়ে মানুষের সেবা করার আকাঙ্ক্ষার মধ্যে ব্যক্তিগত সাফল্যের পাশাপাশি সামাজিক দায়বদ্ধতার ভাবনাও রয়েছে।
তাঁদের এই স্বপ্ন বাস্তবায়িত হলে সেটি শুধু একটি পরিবারের গর্বের কারণ হবে না; তাঁদের গ্রামের জন্যও তা হয়ে উঠতে পারে এক বড় অনুপ্রেরণা।
দুই বোনের গল্পে একসঙ্গে রয়েছে সংগ্রাম ও সম্ভাবনা
যজ্ঞসেনী ও দিব্যসেনীর কাহিনিতে একাধিক স্তর রয়েছে।
এখানে আছে আর্থিক সীমাবদ্ধতা।
আছে প্রযুক্তিগত প্রতিবন্ধকতা।
আছে প্রত্যন্ত এলাকার শিক্ষাব্যবস্থার বাস্তবতা।
আছে বারবার চেষ্টা করার মানসিক শক্তি।
আছে ভাইবোনের মতো দুই বোনের পারস্পরিক সহযোগিতা।
আছে বাবা-মায়ের অটুট বিশ্বাস।
আর সবশেষে আছে একটি বড় স্বপ্ন—চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন।
এই সমস্ত বিষয় একত্রিত হয়েই তাঁদের NEET সাফল্যের গল্প তৈরি করেছে।
তাঁদের জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা সম্ভবত এখানেই—পরিস্থিতি সবসময় নিজের অনুকূলে থাকবে না। কিন্তু পরিস্থিতি প্রতিকূল হলেই যে লক্ষ্য ছেড়ে দিতে হবে, এমন কোনও নিয়ম নেই।
যদি বাড়িতে নেটওয়ার্ক না থাকে, তাহলে বিকল্প জায়গা খুঁজে নিতে হয়।
যদি কোচিংয়ের সামর্থ্য না থাকে, তাহলে আত্মপাঠের পথ তৈরি করতে হয়।
যদি প্রথম চেষ্টায় ব্যর্থতা আসে, তাহলে আবার চেষ্টা করতে হয়।
আর যদি পথ দীর্ঘ হয়, তাহলে একসঙ্গে হাঁটার জন্য পাশে থাকা মানুষগুলির হাত শক্ত করে ধরতে হয়।
যজ্ঞসেনী ও দিব্যসেনী ঠিক সেটাই করেছেন।
পাহাড় থেকে মেডিক্যাল কলেজের পথে
একদিন যে পাহাড়ের ঢালে বসে তাঁরা মোবাইলে ক্লাস করতেন, সেই স্মৃতি তাঁদের জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে থাকবে। সেই পাহাড় তাঁদের কাছে শুধু ভৌগোলিক উচ্চতা নয়; সেটিই ছিল তাঁদের স্বপ্নের পথে ওঠার প্রতীক।
পাহাড়ে উঠে সিগন্যাল খোঁজার সেই দিনগুলি হয়তো একদিন অতীত হয়ে যাবে। মেডিক্যাল কলেজে পড়াশোনা, হাসপাতালের করিডর, রোগীদের চিকিৎসা—সবই তাঁদের ভবিষ্যতের নতুন বাস্তবতা হতে পারে।
কিন্তু সেই নতুন জীবনের ভিত তৈরি হয়েছে মহুলপঙ্খার সীমিত সুযোগের মধ্যেই।
তাঁদের সাফল্য তাই শুধু পরীক্ষার নম্বর বা মেধাতালিকার বিষয় নয়। এটি একটি মানসিকতার সাফল্য।
যে মানসিকতা বলে—‘আমার কাছে সুযোগ কম, তাই আমি চেষ্টা করব না’ নয়; বরং ‘আমার কাছে সুযোগ কম, তাই আমাকে আরও বেশি চেষ্টা করতে হবে।’
এই পার্থক্যই যজ্ঞসেনী ও দিব্যসেনীকে আলাদা করে তুলেছে।
ভবিষ্যতের শিক্ষার্থীদের জন্য অনুপ্রেরণার গল্প
ময়ূরভঞ্জের এই দুই বোনের সাফল্য ইতিমধ্যেই অনুপ্রেরণার গল্প হয়ে উঠেছে। তাঁদের পথচলা বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকার সেইসব শিক্ষার্থীদের সাহস জোগাতে পারে, যারা সুযোগের অভাবে নিজেদের স্বপ্নকে ছোট করে দেখতে শুরু করে।
তাঁদের কাহিনি বলে—পরিস্থিতি আপনার পথ কঠিন করতে পারে, কিন্তু আপনার লক্ষ্য নির্ধারণ করার অধিকার আপনার নিজের।
একটি মোবাইল ফোন, সীমিত ইন্টারনেট, আত্মপাঠের ইচ্ছা এবং পরিবারের সমর্থন—এই সামান্য সম্পদ দিয়েও বড় স্বপ্নের দিকে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব।
অবশ্যই, প্রত্যেক শিক্ষার্থীর জন্য একই পথ কার্যকর হবে না। এবং কোনও শিক্ষার্থীর সাফল্যের গল্প দিয়ে শিক্ষার পরিকাঠামোগত সমস্যাগুলিকে অস্বীকার করা যায় না। বরং এই গল্পগুলি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে প্রত্যন্ত এলাকার মেধাবী শিক্ষার্থীদের আরও বেশি সুযোগ ও সহায়তা দেওয়া কতটা জরুরি।
যদি একটি গ্রামের দুই তরুণী এত সীমাবদ্ধতার মধ্যেও NEET-এর মতো কঠিন পরীক্ষায় সাফল্য অর্জন করতে পারেন, তাহলে যথাযথ সুযোগ, উন্নত ইন্টারনেট, মানসম্মত শিক্ষা এবং সুলভ প্রশিক্ষণ পেলে প্রত্যন্ত ভারতের আরও কত প্রতিভা সামনে আসতে পারে—সেই প্রশ্নও উঠে আসে।
শেষ কথা: স্বপ্নের পথে উচ্চতাই বাধা নয়
যজ্ঞসেনী ও দিব্যসেনীর গল্পের শুরু হয়েছিল একটি প্রত্যন্ত গ্রামে। সেখানে মোবাইল নেটওয়ার্ক দুর্বল ছিল, পরিবারের আর্থিক সামর্থ্য সীমিত ছিল এবং নামী কোচিংয়ের দরজা তাঁদের জন্য সহজে খোলা ছিল না।
কিন্তু তাঁদের স্বপ্নের কোনও সীমা ছিল না।
তাই বাড়িতে সিগন্যাল না পেলে তাঁরা পাহাড়ে উঠেছেন।
প্রশিক্ষণের সুযোগ সীমিত হলে আত্মপাঠকে বেছে নিয়েছেন।
প্রথমবার ব্যর্থ হলে আবার পরীক্ষা দিয়েছেন।
আর কঠিন সময়ে একে অপরের পাশে থেকেছেন।
আজ NEET 2026-এর সাফল্য তাঁদের সেই দীর্ঘ যাত্রার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।
তাঁদের গল্প আমাদের মনে করিয়ে দেয়—স্বপ্নের উচ্চতা নির্ধারণ করে না আপনার গ্রামের অবস্থান, পরিবারের আর্থিক সামর্থ্য কিংবা আপনার কাছে থাকা সুযোগের সংখ্যা। স্বপ্নের উচ্চতা নির্ধারণ করে আপনি সেই স্বপ্নের জন্য কতটা দৃঢ়ভাবে লড়তে প্রস্তুত।
মহুলপঙ্খার পাহাড়ে বসে যে দুই বোন একদিন চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্নের ক্লাস করেছিলেন, আজ তাঁদের সামনে খুলে গেছে নতুন এক পথ।
সেই পথের শেষ কোথায়, তা এখনও অজানা।
কিন্তু একটি বিষয় স্পষ্ট—যে দুই তরুণী নেটওয়ার্কের জন্য পাহাড়ে উঠতে ভয় পাননি, তাঁরা নিজেদের স্বপ্নের উচ্চতায় পৌঁছতেও পিছিয়ে যাবেন না।
তাঁদের সাফল্য তাই শুধু NEET-এর ফল নয়। এটি অধ্যবসায়ের জয়, আত্মবিশ্বাসের জয় এবং সীমাবদ্ধতার মধ্যেও সম্ভাবনাকে খুঁজে নেওয়ার জয়।
আর সেই কারণেই যজ্ঞসেনী ও দিব্যসেনীর কাহিনি আজ শুধু একটি গ্রামের গল্প নয়—এটি প্রত্যন্ত ভারতের অসংখ্য স্বপ্নবাজ শিক্ষার্থীর জন্য এক উজ্জ্বল বার্তা:
“পথ যত দুর্গমই হোক, স্বপ্ন যদি সত্যি হয় এবং চেষ্টা যদি থেমে না যায়, তাহলে একদিন পাহাড়ের চূড়া থেকেও সাফল্যের আকাশ দেখা যায়।”
আরও পড়ুন: Chilukuri Santhamma: ৯৭ বছরের জীবন, অবসরকে যিনি দেখেন নতুন শিক্ষার শুরু হিসেবে!!!








