কমনওয়েলথ গেমস ২০২৬: গ্লাসগোতে ভারতীয় ক্রীড়াবিদদের ঐতিহাসিক প্রতিরোধ, নতুনদের উত্থান ও আন্তর্জাতিক মঞ্চে ভারতের নতুন দিগন্ত
২০২৬ সালের গ্লাসগো কমনওয়েলথ গেমসের পর্দা নেমেছে এক অবিস্মরণীয় অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে। বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ বহুক্রীড়া প্রতিযোগিতায় প্রতিকূল শর্ত, সীমিত ইভেন্ট তালিকা এবং মূল পদকপ্রাপ্ত ক্ষেত্রগুলির অনুপস্থিতি সত্ত্বেও ভারতীয় অ্যাথলিটরা যা প্রদর্শন করেছেন, তা আন্তর্জাতিক ক্রীড়া ইতিহাসে এক স্মরণীয় অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে।
গ্লাসগো গেমসের এই আসরে ২৩ জুলাই থেকে ২ আগস্ট ২০২৬ পর্যন্ত অনুষ্ঠিত প্রতিযোগিতায় ভারতীয় অ্যাথলিটদের পারফরম্যান্স ছিল একাধারে আত্মবিশ্বাসী, সুসংগঠিত এবং কৌশলগতভাবে শক্তিশালী। ঐতিহ্যগতভাবে যে সমস্ত ডিসিপ্লিন থেকে ভারত সবচেয়ে বেশি পদক অর্জন করত—যেমন কুস্তি, শুটিং, ব্যাডমিন্টন, টেবিল টেনিস ও হকি—সেগুলি এই আসরে অন্তর্ভুক্ত ছিল না। তবুও, মোট ৩৯টি পদক (১৩টি স্বর্ণ, ১৭টি রৌপ্য এবং ৯টি ব্রোঞ্জ) জয় করে পদক তালিকার চতুর্থ স্থানে নিজেদের অবস্থান সুদৃঢ় করেছে ভারত।
১. পদক তালিকা: গ্লাসগো ২০২৬-এর চূড়ান্ত পরিসংখ্যান
কমনওয়েলথ গেমস ২০২৬-এর চূড়ান্ত পদক তালিকায় দেখা যায় অস্ট্রেলিয়ার একচ্ছত্র আধিপত্য, যার পর যথাক্রমে ইংল্যান্ড, কানাডা এবং ভারত অবস্থান করছে। আয়োজক দেশ স্কটল্যান্ডের সমান মোট পদক (৩৯টি) হলেও, রৌপ্য পদকের ব্যবধানে স্কটল্যান্ডকে পেছনে ফেলে চার নম্বরে শেষ করে ভারত।
গ্লাসগো ২০২৬: শীর্ষ দেশসমূহের পদক তালিকা
| স্থান | দেশ | স্বর্ণ | রৌপ্য | ব্রোঞ্জ | মোট পদক |
| ১ | অস্ট্রেলিয়া | ৭০ | ৪৫ | ৫৬ | ১৭১ |
| ২ | ইংল্যান্ড | ২৯ | ৪৫ | ৩৬ | ১১০ |
| ৩ | কানাডা | ১৯ | ২০ | ২৩ | ৬২ |
| ৪ | ভারত | ১৩ | ১৭ | ৯ | ৩৯ |
| ৫ | স্কটল্যান্ড | ১৩ | ৯ | ১৭ | ৩৯ |
| ৬ | নিউজিল্যান্ড | ১০ | ১৪ | ১২ | ৩৬ |
| ৭ | নাইজেরিয়া | ১০ | ৭ | ৭ | ২৪ |
| ৮ | জামাইকা | ১০ | ৪ | ৫ | ১৯ |
২. গ্লাসগোতে ভারতের স্বর্ণালী সাফল্যের পূর্ণাঙ্গ তালিকা
ভারতীয় প্রতিযোগীদের মধ্যে ১৩ জন স্বর্ণপদক বিজয়ী এবং তাদের নিজ নিজ ইভেন্টের বিবরণ নিচে তুলে ধরা হলো:
ভারতীয় স্বর্ণপদক বিজয়ী (১৩টি স্বর্ণ)
| খেলোয়াড় / ক্রীড়াবিদের নাম | খেলা / ইভেন্ট | ক্যাটাগরি / বিভাগ |
| সাইখোম মীরাবাই চানু | ভারোত্তোলন | মহিলা ৪৮ কেজি |
| শর্মিলা ধানকার | প্যারা অ্যাথলেটিক্স | মহিলা শট পুট (F57) |
| দিলীপ মহাদু গাভিত | প্যারা অ্যাথলেটিক্স | পুরুষ ১০০ মিটার (T47) |
| সোমন রানা | প্যারা অ্যাথলেটিক্স | পুরুষ শট পুট (F57) |
| অস্মিতা দে | জুডো | মহিলা ৪৮ কেজি |
| হর্ষ সিং | জুডো | পুরুষ ৬০ কেজি |
| সাক্ষী চৌধুরী | বক্সিং | মহিলা ৫১ কেজি |
| প্রীতি পওয়ার | বক্সিং | মহিলা ৫৪ কেজি |
| জ্যাসমিন ল্যাম্বোরিয়া | বক্সিং | মহিলা ৫৭ কেজি |
| প্রিয়া ঘানঘাস | বক্সিং | মহিলা ৬০ কেজি |
| অরুন্ধতী চৌধুরী | বক্সিং | মহিলা ৭০ কেজি |
| শচীন সিওয়াচ | বক্সিং | পুরুষ ৬০ কেজি |
| অঙ্কুশ পাংঘাল | বক্সিং | পুরুষ ৮০ কেজি |
৩. ভারতীয় রৌপ্য ও ব্রোঞ্জ পদক বিজয়ী
রৌপ্য পদক বিজয়ী (১৭টি রৌপ্য)
ভারোত্তোলন: ঋষিকান্ত সিং (পুরুষ ৬০ কেজি), মুথুপান্ডি রাজা (পুরুষ ৬৫ কেজি), জ্ঞানেশ্বরী যাদব (মহিলা ৫৩ কেজি), হরজিন্দর কৌর (মহিলা ৬৯ কেজি), ভাল্লুরি অজয় বাবু (পুরুষ ৭৯ কেজি), লভপ্রীত সিং (পুরুষ +১১০ কেজি)।
অ্যাথলেটিক্স: সর্বেশ অনিল কুশারে (পুরুষ হাই জাম্প), গুলবীর সিং (পুরুষ ১০,০০০ মিটার), মুরলী শ্রীশঙ্কর (পুরুষ লং জাম্প), নীরজ চোপড়া (পুরুষ জ্যাভলিন থ্রো), প্রবীণ চিত্রভেল (পুরুষ ট্রিপল জাম্প)।
প্যারা অ্যাথলেটিক্স: মোহাম্মদ বাসিল (পুরুষ ১০০ মিটার T47), শুভম জুয়াল (পুরুষ শট পুট F57)।
জুডো: ইয়ামিনি মৌর্য (মহিলা ৫৭ কেজি)।
বক্সিং: জাদুমণি সিং (পুরুষ ৫৫ কেজি), লভলিনা বরগোঁহাই (মহিলা ৭৫ কেজি), নরেন্দর বেরওয়াল (পুরুষ +৯০ কেজি)।
ব্রোঞ্জ পদক বিজয়ী (৯টি ব্রোঞ্জ)
প্যারা পাওয়ারলিফটিং: ঝান্ডু কুমার (পুরুষ হেভিওয়েট)।
ভারোত্তোলন: বিন্দিয়ারানী দেবী (মহিলা ৫৮ কেজি)।
প্যারা অ্যাথলেটিক্স: শিল্পা শাইলা (মহিলা শট পুট F57)।
অ্যাথলেটিক্স: গুলবীর সিং (পুরুষ ৫,০০০ মিটার), সিমা কালীরমণা (মহিলা ডিসকাস থ্রো), যশবীর সিং (পুরুষ জ্যাভলিন থ্রো), সেলভা প্রভু তিরুমারন (পুরুষ ট্রিপল জাম্প), তেজস্বিন শঙ্কর (পুরুষ ডেকাথলন)।
৪. ক্রীড়াক্ষেত্রভিত্তিক পারফরম্যান্স বিশ্লেষণ
(ক) বক্সিং: রিংয়ে ভারতের অভূতপূর্ব একচ্ছত্র আধিপত্য
গ্লাসগো গেমসে ভারতের সবচেয়ে বড় সাফল্যের গল্প এসেছে বক্সিং রিং থেকে। রিংয়ে ভারতীয় মুষ্টিযোদ্ধারা মোট ১০টি পদক জয় করেন, যার মধ্যে ৭টিই ছিল স্বর্ণপদক।
১ আগস্ট ২০২৬ তারিখটি ভারতীয় বক্সিংয়ের ইতিহাসে এক স্বর্ণাক্ষরে লেখা দিন হিসেবে চিহ্নিত থাকবে, যখন একই দিনে সাতজন ভারতীয় রিংয়ে নেমে সাতটিই স্বর্ণপদক ছিনিয়ে নেন। মহিলা বিভাগে সাক্ষী চৌধুরী (৫১ কেজি), প্রীতি পওয়ার (৫৪ কেজি), জ্যাসমিন ল্যাম্বোরিয়া (৫৭ কেজি), প্রিয়া ঘানঘাস (৬০ কেজি) এবং অরুন্ধতী চৌধুরী (৭০ কেজি) প্রতিপক্ষদের ওপর মানসিক ও কৌশলগত আধিপত্য বিস্তার করেন। পুরুষদের বিভাগে শচীন সিওয়াচ (৬০ কেজি) এবং অঙ্কুশ পাংঘাল (৮০ কেজি) অসাধারণ ফুটওয়ার্ক এবং ক্ষমতার প্রদর্শনে প্রতিপক্ষকে পরাস্ত করেন।
(খ) অ্যাথলেটিক্স ও প্যারা অ্যাথলেটিক্স: ট্র্যাক অ্যান্ড ফিল্ডে নতুন আশা
অ্যাথলেটিক্স ও প্যারা অ্যাথলেটিক্স বিভাগ থেকে ভারতের ঝুলিতে এসেছে মোট ১৬টি পদক (৩টি স্বর্ণ, ৮টি রৌপ্য ও ৫টি ব্রোঞ্জ)।
গুলবীর সিং: আলিগড়ের ২৮ বছর বয়সী এই অ্যাথলিট পুরুষদের ১০,০০০ মিটারে রৌপ্য এবং ৫,০০০ মিটারে ব্রোঞ্জ জয় করে ইতিহাস গড়েন। একই কমনওয়েলথ গেমসে দুটি একক ট্র্যাক ইভেন্টে পদকজয়ী প্রথম ভারতীয় অ্যাথলিট তিনি।
নীরজ চোপড়া: অলিম্পিক স্বর্ণপদকজয়ী জ্যাভলিন তারকা নীরজ চোপড়া গ্লাসগোতে রৌপ্যপদক জয় করেন। তার পাশাপাশি নতুন প্রতিভা যশবীর সিং ব্রোঞ্জ জিতে জ্যাভলিনে ভারতের শক্তি প্রদর্শন করেন।
প্যারা অ্যাথলেটিক্স: দিলীপ মহাদু গাভিত (১০০ মিটারে স্বর্ণ), শর্মিলা ধানকার (শট পুটে স্বর্ণ) এবং সোমন রানা (শট পুটে স্বর্ণ) পারফরম্যান্সে নতুন মাত্রা যোগ করেন।
(গ) ভারোত্তোলন: মীরাবাইয়ের নেতৃত্বে ধারাবাহিকতা
ভারোত্তোলনে ভারতের ঐতিহ্য বজায় রেখে অলিম্পিক পদকজয়ী সাইখোম মীরাবাই চানু মহিলা ৪৮ কেজি বিভাগে পুনরায় স্বর্ণ জয় করেন। এছাড়া বিভিন্ন ওজন বিভাগে ৬টি রৌপ্য এবং ১টি ব্রোঞ্জসহ মোট ৮টি পদক নিশ্চিত করেন ভারতীয় ভারোত্তোলকরা।
(ঘ) জুডো: ঐতিহাসিক জোড়া স্বর্ণ
জুডোতে আগে ভারত কমনওয়েলথ পর্যায়ে রৌপ্য বা ব্রোঞ্জে সীমাবদ্ধ থাকলেও গ্লাসগো ২০২৬-এ ইতিহাস লিখিত হয়। অস্মিতা দে (মহিলা ৪৮ কেজি) এবং হর্ষ সিং (পুরুষ ৬০ কেজি) স্বর্ণপদক জিতে নতুন মাইলফলক স্থাপন করেন।
৫. দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা ও সরকারি পরিকাঠামো
গ্লাসগোর এই সাফল্যের পেছনে ছিল কেন্দ্রীয় ক্রীড়া মন্ত্রক, সাই (Sports Authority of India) এবং বিভিন্ন ফেডারেশনের পরিকল্পিত উদ্যোগ।
১. টপস (TOPS) ও পরিকল্পনা: ‘টার্গেট অলিম্পিক পোডিয়াম স্কিম’ (TOPS)-এর মাধ্যমে শীর্ষস্থানীয় এবং সম্ভাবনাময় ক্রীড়াবিদদের আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ, বিশ্বমানের কোচ এবং প্রযুক্তিগত সহায়তা দেওয়া হয়েছে।
২. বিদেশি প্রশিক্ষণ ক্যাম্প: গেমসের ঠিক আগে অ্যাথলিটদের পোল্যান্ডের স্পালা অলিম্পিক ট্রেনিং সেন্টারে, বক্সারদের বেলফাস্টে এবং ভারোত্তোলকদের বার্মিংহামে বিশেষ আন্তর্জাতিক কন্ডিশনিং ক্যাম্প করানো হয়।
৩. স্পোর্টস সায়েন্সের প্রয়োগ: বায়োমেকানিক্স, পুষ্টিবিদ্যা এবং ক্রীড়া মনস্তত্ত্বের সমন্বয় ঘটিয়ে প্লেয়ারদের ইনজুরি ম্যানেজমেন্ট ও রিকভারি জোরদার করা হয়েছে।
৬. ভবিষ্যতের রূপরেখা: আহমেদাবাদ ২০৩০-এর দিকে লক্ষ্য
গ্লাসগো গেমস প্রমাণ করেছে যে ভারত শুধু তার প্রথাগত শক্তিস্থানগুলোর ওপর নির্ভরশীল নয়। কুস্তি, শুটিং বা ব্যাডমিন্টনের মতো নিয়মিত পদকভিত্তিক খেলা না থাকা সত্ত্বেও ভারত চতুর্থ স্থানে শেষ করেছে। ২০৩০ সালে কমনওয়েলথ গেমস ভারতের আহমেদাবাদে অনুষ্ঠিত হওয়ার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে। ঘরের মাঠে যখন প্রথাগত ইভেন্টগুলো ফিরবে, তখন ভারত তালিকার শীর্ষস্থানে যাওয়ার শক্ত দাবিদার হবে বলে আশা করছেন বিশ্লেষকরা।
গ্লাসগো ২০২৬ তাই কেবল একটি ক্রীড়া প্রতিযোগিতা নয়, এটি আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গনে ভারতের এক নতুন অধ্যায়ের উন্মোচন।





