Sonar Bangla Framework:বিগত শতকের ছয়ের দশক থেকে যে শিল্প গরিমা হারিয়েছিল পশ্চিমবঙ্গ, সেই হৃতগৌরব পুনরুদ্ধারে এবার কোমর বেঁধে নামছে কেন্দ্র ও নীতি আয়োগ। রাজ্যে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরেই বাংলার অর্থনৈতিক ও শিল্প মানচিত্রকে আমূল বদলে ফেলার জন্য একটি মাস্টারপ্ল্যান বা রোডম্যাপ তৈরি করা হচ্ছে। অন্ধ্রপ্রদেশ, বিহার বা ওড়িশার ধাঁচে এবার বাংলাও পেতে চলেছে বিশেষ আর্থিক সহায়তা, যা নীতি আয়োগের অন্দরে আপাতত ‘সোনার বাংলা ফ্রেমওয়ার্ক’ নামে পরিচিত।
মূল ফোকাস: বৃহৎ শিল্প নয়, আগে পুনরুজ্জীবন
কেন্দ্রীয় সরকার এবং নীতি আয়োগের প্রাথমিক লক্ষ্য এখনই কোনো বিশাল মেগা-ইন্ডাস্ট্রি তৈরি করা নয়। বরং, যে ক্ষেত্রগুলি একদা বাংলার লক্ষ লক্ষ মানুষের কর্মসংস্থানের প্রধান উৎস ছিল, সেগুলিকে পুনরুজ্জীবিত করা। এই পরিকল্পনার মূল স্তম্ভগুলি হলো:
টার্গেট সেক্টর: পাটশিল্প (Jute), বস্ত্রশিল্প (Textile), ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (MSME) এবং ক্ষুদ্র ইঞ্জিনিয়ারিং ইউনিট।
প্রধান অঞ্চল: হাওড়া, হুগলি, দুর্গাপুর এবং আসানসোল। এই অঞ্চলগুলিতে নতুন করে আধুনিক শিল্পতালুক গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে।
নীতি আয়োগের ব্লু প্রিন্ট ও ‘সোনার বাংলা ফ্রেমওয়ার্ক’
সদ্য নীতি আয়োগের ভাইস চেয়ারম্যান পদে নিযুক্ত হয়েছেন বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ অশোক কুমার লাহিড়ী। তাঁর নেতৃত্বেই বাংলার জন্য এই বিশেষ ব্লু প্রিন্ট বা অ্যাকশন প্ল্যান তৈরি করছে নীতি আয়োগ।
প্রকল্পভিত্তিক সহায়তা: রাজনৈতিক বা কৌশলগত কারণে একে সরাসরি ‘বেঙ্গল প্যাকেজ’ নাম দেওয়া না হলেও, এটি আসলে একটি সুসংহত অর্থনৈতিক প্যাকেজ। আগামী দিনে রাজ্যের অন্তর্বর্তী বাজেট এবং পরবর্তী কেন্দ্রীয় বাজেটে এর প্রতিফলন দেখা যাবে। একাধিক কেন্দ্রীয় মন্ত্রক পশ্চিমবঙ্গ সরকারের সঙ্গে সমন্বয় রেখে এই রূপরেখা বাস্তবায়িত করবে।
লজিস্টিকস ও পরিকাঠামো: ডানকুনি ফ্রেট করিডর
এই শিল্প বিপ্লবের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হতে চলেছে ডানকুনি শিল্প করিডর এবং ডেডিকেটেড ফ্রেট করিডর (Freight Corridor)। পণ্য পরিবহণ ব্যবস্থা দ্রুত ও মসৃণ করতে আগামী কয়েক বছরের মধ্যে রাজ্যে একাধিক নতুন এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে, যার জন্য দ্রুত জমি অধিগ্রহণের কাজ শুরু হতে পারে।
নতুন বাণিজ্যিক মডেল: আন্তঃরাজ্য সমঝোতা (Inter-State MoU)
কেন্দ্রীয় সরকার এবার যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় এক অভিনব বাণিজ্যিক মডেল নিয়ে আসতে চলেছে। এতদিন রাজ্যগুলির মধ্যে কেবল বাণিজ্যিক প্রতিযোগিতা দেখা যেত, কিন্তু এবার থেকে শুরু হবে ‘বাণিজ্যিক সহায়তা’।
যেমন দুটি দেশের মধ্যে বাণিজ্যিক চুক্তি হয়, ঠিক তেমনি উৎপাদক রাজ্য (যেমন পশ্চিমবঙ্গ) এবং ক্রেতা বা গ্রহণকারী রাজ্যের মধ্যে সরাসরি সমঝোতাপত্র (MoU) স্বাক্ষরিত হবে।
এর ফলে বাংলায় উৎপাদিত পাট, বস্ত্র বা ক্ষুদ্র ইঞ্জিনিয়ারিং পণ্য সরাসরি অন্যান্য রাজ্যের বাজারে পৌঁছে যাবে।
পরবর্তী পদক্ষেপ: টাস্ক ফোর্স ও ল্যান্ড ব্যাংক
এই মেগা প্রজেক্টকে বাস্তবে রূপ দিতে একটি উচ্চপর্যায়ের শিল্পসংক্রান্ত টাস্ক ফোর্স গঠন করা হচ্ছে। প্রথম ধাপে জমি অধিগ্রহণ এবং একটি সুনির্দিষ্ট ‘ল্যান্ড ব্যাংক’ (Land Bank) তৈরি করা হবে। জমি সংক্রান্ত জটিলতা কাটলেই চূড়ান্ত শিল্প মানচিত্র (Industrial Map) প্রকাশ করা হবে।
সব মিলিয়ে, কেন্দ্রের এই দূরদর্শী রোডম্যাপ যদি সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হয়, তবে ঐতিহ্যবাহী শিল্পাঞ্চল হাওড়া-হুগলি এবং দুর্গাপুর-আসানসোল আবার দেশের অন্যতম প্রধান অর্থনৈতিক হাব হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারবে।





