Homeস্বাস্থ্যJapan: ‘ইনেমুরি’: কাজের ফাঁকে ছোট্ট ঘুমেই বাড়ছে কর্মক্ষমতা, কমছে মানসিক চাপ!!!

Japan: ‘ইনেমুরি’: কাজের ফাঁকে ছোট্ট ঘুমেই বাড়ছে কর্মক্ষমতা, কমছে মানসিক চাপ!!!

জাপানের ‘ইনেমুরি’: কাজের ফাঁকে ছোট্ট ঘুমেই বাড়ছে কর্মক্ষমতা, কমছে মানসিক চাপ

বর্তমান যুগে মানুষের জীবন যেন এক অন্তহীন দৌড়ের নাম। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত কাজ, পড়াশোনা, যাতায়াত, মোবাইল ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যস্ততায় পর্যাপ্ত ঘুম এখন অনেকের কাছেই বিলাসিতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। চিকিৎসকদের মতে, অনিয়মিত ঘুমের কারণে বাড়ছে মানসিক চাপ, ক্লান্তি, উদ্বেগ, এমনকি হৃদরোগ ও ডায়াবেটিসের ঝুঁকিও। এই পরিস্থিতিতে জাপানের একটি অভিনব অভ্যাস আবারও বিশ্বজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে— ‘ইনেমুরি’ (Inemuri)।

জাপানের মানুষ কর্মনিষ্ঠ ও শৃঙ্খলাপরায়ণ হিসেবে বিশ্বজুড়ে পরিচিত। দীর্ঘ কর্মঘণ্টা ও চাপপূর্ণ জীবনযাত্রার মাঝেও তারা নিজেদের শরীর ও মনকে সুস্থ রাখতে কিছু বিশেষ অভ্যাস গড়ে তুলেছে। তার মধ্যেই অন্যতম হল ‘ইনেমুরি’। জাপানি এই সংস্কৃতি এখন শুধু দেশটির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং বিশ্বের বিভিন্ন দেশে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, মনোবিজ্ঞানী ও কর্পোরেট সংস্থাগুলোর আগ্রহের বিষয় হয়ে উঠেছে।

কী এই ‘ইনেমুরি’?

‘ইনেমুরি’ শব্দটি এসেছে দুটি জাপানি শব্দ থেকে— “ইনে” অর্থাৎ ঘুম এবং “মুরি” অর্থাৎ উপস্থিত থাকা। সহজভাবে বলতে গেলে, কাজের মাঝখানে বা যাতায়াতের সময় অল্প সময়ের জন্য চোখ বুজে বিশ্রাম নেওয়াকেই বলা হয় ইনেমুরি। এটি পূর্ণাঙ্গ ঘুম নয়, বরং কয়েক মিনিটের একটি স্বল্প বিশ্রাম, যা শরীর ও মস্তিষ্ককে পুনরুজ্জীবিত করে।

জাপানে ট্রেন, মেট্রো, অফিস, লাইব্রেরি কিংবা অপেক্ষাকক্ষে মানুষকে মাঝেমধ্যে মাথা নিচু করে কয়েক মিনিটের জন্য ঘুমিয়ে নিতে দেখা যায়। আশ্চর্যের বিষয় হল, সেখানে এটিকে অলসতা বা দায়িত্বহীনতা হিসেবে দেখা হয় না। বরং এটি বোঝায় যে ব্যক্তি অত্যন্ত পরিশ্রম করেছেন এবং সামান্য বিশ্রামের প্রয়োজন অনুভব করছেন।

জাপানি কর্মসংস্কৃতিতে ইনেমুরির গুরুত্ব

জাপানের কর্মসংস্কৃতি অত্যন্ত কঠোর। অনেক কর্মী প্রতিদিন দীর্ঘ সময় অফিসে কাজ করেন। এমনকি অতিরিক্ত কাজের চাপে মৃত্যুর ঘটনাও সেখানে ঘটেছে, যার জন্য একটি বিশেষ শব্দ রয়েছে— “কারোশি” অর্থাৎ অতিরিক্ত কাজের কারণে মৃত্যু।

এই চাপপূর্ণ জীবনে ইনেমুরি যেন এক ছোট্ট স্বস্তির আশ্রয়। অফিসে কয়েক মিনিটের বিশ্রাম কর্মীদের মানসিক ক্লান্তি দূর করতে সাহায্য করে। অনেক সংস্থা এখন কর্মীদের জন্য বিশেষ বিশ্রামকক্ষ তৈরি করছে, যেখানে তারা ১৫ থেকে ২০ মিনিটের ছোট্ট ঘুম নিতে পারেন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, দিনের মাঝামাঝি এই স্বল্প বিশ্রাম কর্মীদের মনোযোগ বাড়ায়, ভুল কমায় এবং কাজের দক্ষতা উন্নত করে। ফলে সংস্থার উৎপাদনশীলতাও বাড়ে।

বিজ্ঞান কী বলছে?

বিশ্বজুড়ে ঘুম নিয়ে গবেষণা করা বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, স্বল্প সময়ের দিবানিদ্রা মানুষের শরীরের জন্য অত্যন্ত উপকারী হতে পারে। বিশেষ করে ১০ থেকে ২০ মিনিটের ঘুম মস্তিষ্ককে সতেজ করে এবং স্মৃতিশক্তি উন্নত করতে সাহায্য করে।

চিকিৎসকদের মতে, দিনের বেলায় অল্প সময়ের বিশ্রামের ফলে—

  • ক্লান্তি কমে
  • মানসিক চাপ হ্রাস পায়
  • মনোযোগ ও একাগ্রতা বৃদ্ধি পায়
  • কাজের গতি বাড়ে
  • মেজাজ ভালো থাকে
  • হৃদযন্ত্রের উপর চাপ কমে

বিশেষজ্ঞরা আরও জানিয়েছেন, দীর্ঘ সময় একটানা কাজ করলে মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা কমে যায়। ইনেমুরি সেই ক্লান্ত মস্তিষ্ককে কিছুক্ষণের জন্য পুনরুজ্জীবিত করে।

ইনেমুরি ও মানসিক স্বাস্থ্য

বর্তমানে বিশ্বজুড়ে মানসিক অবসাদ, উদ্বেগ ও কর্মক্ষয় (Burnout) একটি বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তরুণ প্রজন্মের মধ্যে রাত জেগে কাজ বা মোবাইল ব্যবহারের কারণে ঘুমের সমস্যা বাড়ছে।

মনোরোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, শরীর যেমন বিশ্রাম চায়, তেমনই মস্তিষ্কেরও বিশ্রামের প্রয়োজন রয়েছে। ইনেমুরি সেই সুযোগটাই করে দেয়। অল্প সময়ের এই ঘুম মস্তিষ্কের চাপ কমিয়ে মনকে হালকা করতে সাহায্য করে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, যাঁদের রাতে পর্যাপ্ত ঘুম হয় না বা অতিরিক্ত কাজের চাপ থাকে, তাঁদের জন্য দিনের বেলায় স্বল্প সময়ের বিশ্রাম অত্যন্ত উপকারী হতে পারে।

কেন ২০ মিনিটের বেশি নয়?

যদিও ইনেমুরি উপকারী, তবে এরও কিছু নিয়ম রয়েছে। চিকিৎসকেরা সতর্ক করেছেন যে, এই ঘুম যেন ২০ মিনিটের বেশি না হয়।

কারণ, দীর্ঘ সময় ঘুমিয়ে পড়লে শরীর গভীর ঘুমের স্তরে প্রবেশ করে। তখন হঠাৎ ঘুম ভাঙলে মাথা ভার লাগা, দুর্বলতা, বিরক্তি বা মনোযোগের অভাব দেখা দিতে পারে। এই অবস্থাকে বলা হয় “স্লিপ ইনারশিয়া”।

তাই বিশেষজ্ঞদের মতে, ইনেমুরির আদর্শ সময় ১০ থেকে ২০ মিনিট।

কোন সময় ইনেমুরি সবচেয়ে কার্যকর?

বিশেষজ্ঞদের মতে, দুপুর ১টা থেকে বিকেল ৩টার মধ্যে শরীর স্বাভাবিকভাবেই কিছুটা ক্লান্ত অনুভব করে। এই সময়ে ছোট্ট একটি ঘুম শরীরকে সবচেয়ে বেশি সতেজ করতে পারে।

তবে সন্ধ্যার পরে এই ধরনের ঘুম ক্ষতিকর হতে পারে। কারণ এতে রাতের ঘুমের উপর প্রভাব পড়তে পারে। ফলে অনিদ্রা বা ঘুমের সমস্যা বাড়ার আশঙ্কা থাকে।

ইনেমুরি সেন্টারের জনপ্রিয়তা

জাপানে এখন “ইনেমুরি সেন্টার” বা বিশেষ বিশ্রামকেন্দ্র তৈরি হয়েছে। ব্যস্ত মানুষ সেখানে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য বিশ্রাম নিতে যান।

এই কেন্দ্রগুলিতে আরামদায়ক চেয়ার, হালকা আলো, শান্ত পরিবেশ এবং কখনও কখনও মৃদু সংগীতের ব্যবস্থাও থাকে। কর্মব্যস্ত মানুষ কয়েক মিনিট বিশ্রাম নিয়ে আবার নতুন উদ্যমে কাজে ফিরতে পারেন।

অনেক বড় কর্পোরেট সংস্থা এখন অফিসের মধ্যেই ন্যাপ রুম তৈরি করছে। প্রযুক্তি সংস্থাগুলোর মধ্যে এই প্রবণতা দ্রুত বাড়ছে।

বিশ্বজুড়ে বাড়ছে আগ্রহ

শুধু জাপান নয়, এখন ইউরোপ ও আমেরিকার বহু সংস্থাও কর্মীদের জন্য “পাওয়ার ন্যাপ” ব্যবস্থা চালু করছে।

গবেষণায় দেখা গেছে, দুপুরের ছোট্ট ঘুম কর্মীদের উৎপাদনশীলতা বাড়ায়। ফলে বহু বহুজাতিক সংস্থা কর্মীদের বিশ্রামের জন্য আলাদা জায়গা তৈরি করছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবিষ্যতে কর্মসংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠতে পারে এই ধারণা।

ভারতে কি সম্ভব ইনেমুরি সংস্কৃতি?

ভারতের শহুরে জীবনেও এখন কাজের চাপ ও মানসিক উদ্বেগ দ্রুত বাড়ছে। বিশেষ করে তথ্যপ্রযুক্তি, কর্পোরেট ও স্বাস্থ্য পরিষেবার সঙ্গে যুক্ত কর্মীদের মধ্যে অনিদ্রা ও ক্লান্তির সমস্যা বেশি দেখা যায়।

এই পরিস্থিতিতে অনেকেই মনে করছেন, জাপানের ইনেমুরি সংস্কৃতি ভারতেও চালু করা যেতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, অফিসে ছোট্ট বিশ্রামের ব্যবস্থা থাকলে কর্মীদের মানসিক চাপ কমবে এবং কাজের মানও বাড়বে।

তবে ভারতীয় সমাজে দিনের বেলায় ঘুমকে এখনও অনেক ক্ষেত্রে অলসতার সঙ্গে যুক্ত করা হয়। ফলে এই মানসিকতা বদলানোও একটি বড় চ্যালেঞ্জ।

শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রেও উপকারী?

শুধু কর্মজীবী মানুষ নয়, শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রেও ইনেমুরি উপকারী হতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

পরীক্ষার সময় দীর্ঘক্ষণ পড়াশোনার ফলে মানসিক ক্লান্তি তৈরি হয়। সেই সময় ১৫ মিনিটের একটি বিশ্রাম স্মৃতিশক্তি ও মনোযোগ বাড়াতে সাহায্য করতে পারে।

তবে চিকিৎসকেরা সতর্ক করেছেন, মোবাইল হাতে নিয়ে বিছানায় দীর্ঘ সময় কাটানো কখনও ইনেমুরি নয়। এটি শুধুমাত্র স্বল্প সময়ের পরিকল্পিত বিশ্রাম।

ইনেমুরির কিছু নিয়ম

বিশেষজ্ঞদের মতে, ইনেমুরি করতে হলে কয়েকটি বিষয় মাথায় রাখা জরুরি—

  • ঘুমের সময় ১০-২০ মিনিটের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে হবে
  • দুপুর বা বিকেলের আগে করা ভালো
  • আরামদায়ক ও শান্ত পরিবেশ বেছে নিতে হবে
  • অতিরিক্ত দীর্ঘ ঘুম এড়িয়ে চলতে হবে
  • রাতের ঘুমের বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না

প্রযুক্তির যুগে ঘুমের সংকট

বর্তমানে স্মার্টফোন, ল্যাপটপ ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অতিরিক্ত ব্যবহার মানুষের ঘুমের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, রাত জেগে স্ক্রিন ব্যবহার করলে মস্তিষ্কের স্বাভাবিক ঘুমের চক্র ব্যাহত হয়।

ফলে মানুষ দিনে ক্লান্ত অনুভব করেন। ইনেমুরি সেই ক্লান্তি কিছুটা কমাতে সাহায্য করলেও, এটি কখনও পর্যাপ্ত রাতের ঘুমের বিকল্প নয়।

চিকিৎসকদের মতে, সুস্থ থাকতে একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের প্রতিদিন অন্তত ৭ থেকে ৮ ঘণ্টা ঘুম প্রয়োজন।

ভবিষ্যতের কর্মসংস্কৃতি কি বদলাবে?

বিশ্বজুড়ে এখন কর্মীদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে সচেতনতা বাড়ছে। অনেক সংস্থা কর্মীদের বিশ্রাম, মানসিক সুস্থতা ও কাজের ভারসাম্যের উপর গুরুত্ব দিচ্ছে।

এই পরিস্থিতিতে ইনেমুরি ভবিষ্যতের কর্মসংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

ছোট্ট একটি বিশ্রাম যে মানুষের কর্মক্ষমতা, মনোযোগ ও মানসিক স্বাস্থ্যের উপর এত বড় প্রভাব ফেলতে পারে, জাপানের ইনেমুরি তারই বাস্তব উদাহরণ।

জাপানের ইনেমুরি শুধুমাত্র একটি ঘুমের অভ্যাস নয়, বরং ব্যস্ত জীবনে শরীর ও মনের যত্ন নেওয়ার একটি আধুনিক জীবনধারা। এটি শেখায় যে, কাজের মাঝে সামান্য বিশ্রামও মানুষের জীবনকে আরও সুস্থ ও কার্যকর করে তুলতে পারে।

আজকের দ্রুতগতির জীবনে যেখানে মানুষ ঘুমকে অবহেলা করছে, সেখানে ইনেমুরি যেন এক গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেয়— সুস্থ থাকতে বিশ্রামও সমান জরুরি।

এখন প্রশ্ন একটাই— ভারতসহ বিশ্বের অন্যান্য দেশ কি এই সংস্কৃতিকে গ্রহণ করবে? নাকি দিনের বেলায় কয়েক মিনিটের ঘুমকে এখনও অলসতা হিসেবেই দেখা হবে? সময়ই তার উত্তর দেবে।

আরও পড়ুন :  ভারতের রেল-মানচিত্র!!! ১০০০-এর বেশি স্টেশন নিয়ে শীর্ষে কোন রাজ্য?

Join Our WhatsApp Group For New Update
RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

spot_img

সবচেয়ে জনপ্রিয়