Profitable Farming Idea:বাঙালি বরাবরই প্রথাগত ধান-আলুর চাষে অভ্যস্ত। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে বদলাচ্ছে বাংলার কৃষির রূপরেখা। ড্রাগন ফলের বিপুল জনপ্রিয়তার পর এবার বাংলার বুকে বিপ্লব ঘটাতে চলেছে মধ্যপ্রাচ্যের মরুভূমির মূল্যবান খেজুর। অসম্ভবকে সম্ভব করে পূর্ব মেদিনীপুরের তমলুক ব্লকের খড়িডাঙ্গা গ্রামের এক সাহসী যুবক প্রমাণ করলেন—ইচ্ছে আর সঠিক পরিকল্পনা থাকলে মরুভূমির ‘সোনা’ বাংলার মাটিতেও ফলানো সম্ভব। আরবের বিখ্যাত আজওয়া ও মরিয়ম খেজুর চাষ করে এলাকায় রীতিমতো তাক লাগিয়ে দিয়েছেন তিনি।
ব্যবসার গণ্ডি পেরিয়ে কৃষিতে নতুন জোয়ার
এই অভাবনীয় সাফল্যের পেছনে রয়েছেন খড়িডাঙ্গা গ্রামের উদ্যমী যুবক সুব্রত মণ্ডল। পেশায় আগে ছোটখাটো ব্যবসায়ী হলেও, ছোটবেলা থেকেই মাটির প্রতি তাঁর ছিল এক টান। প্রথাগত চাষের বাইরে গিয়ে নতুন কিছু করার তাগিদ থেকেই তিনি প্রথমে নিজের জমিতে ড্রাগন ফলের চাষ শুরু করেন। সেখানে সাফল্য পাওয়ার পর তাঁর নজর যায় আরও অভিনব একটি ফসলের দিকে।
সুব্রতবাবু জানান, প্রতিবেশি রাষ্ট্র বাংলাদেশে সফরের সময় তিনি প্রথম দেখেন যে সেখানকার মাটিতে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন উন্নত জাতের খেজুরের সফল চাষ হচ্ছে। সেই অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে নিজের এলাকাতেই পরীক্ষামূলকভাবে ড্রাগন ফলের পাশাপাশি আরবীয় খেজুরের চারা রোপণ করেন। ফল মিলেছে হাতেনাতে। মরুভূমির শুষ্ক আবহাওয়ার ফসল এখন থোকা থোকা ঝুলছে তমলুকের সবুজ মাঠে।
“ছোটবেলা থেকেই নতুন কিছু চাষ করার ইচ্ছে ছিল। বাংলাদেশ ভ্রমণের সময় যখন দেখলাম ওখানে আরবের খেজুর হচ্ছে, তখনই ঠিক করি আমাদের মাটিতেও এটা চেষ্টা করব। প্রথমবার পরীক্ষামূলকভাবে লাগিয়েই যে এমন অভাবনীয় ফলন পাব, তা ভাবিনি।”
— সুব্রত মণ্ডল, সফল চাষি
কেন এই চাষ বাংলার কৃষিতে গেম-চেঞ্জার?
গ্রামীণ বাংলায় শীতকালে খেজুরের রস ও গুড় তৈরির চল যুগ যুগ ধরে চলে আসছে। তবে সেই দেশি খেজুরের সাথে আরবের আজওয়া, মরিয়ম বা মেজদুলের পার্থক্য আকাশ-পাতাল। আমদানিকৃত এই খেজুরগুলোর পুষ্টিগুণ যেমন অতুলনীয়, বাজারে এর চাহিদাও তেমনই আকাশছোঁয়া।
বর্তমানে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে যখন চাষবাসে অনিশ্চয়তা বাড়ছে, তখন এই আরবীয় খেজুর চাষ কৃষকদের জন্য এক নতুন আশার আলো। এর মূল কারণগুলো হলো:
স্বল্প জলের প্রয়োজন: খেজুর গাছ প্রাকৃতিকভাবেই কম জলে এবং অতিরিক্ত তাপমাত্রায় টিকে থাকতে পারে। ফলে খরাপ্রবণ বা সেচের সমস্যা থাকা এলাকাতেও এটি লাভজনক।
উচ্চ বাজারমূল্য: বাজারে ভালো মানের আমদানিকৃত আরবের খেজুরের দাম সাধারণ ফলের চেয়ে বহুগুণ বেশি। ফলে স্থানীয় স্তরে এই চাষ কৃষকদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করে তুলবে।
আমদানি নির্ভরতা হ্রাস: দেশে এই মানের খেজুর উৎপাদন বাড়লে মধ্যপ্রাচ্যের ওপর নির্ভরতা কমবে, যা সামগ্রিক কৃষি অর্থনীতিকে চাঙ্গা করবে।
ভবিষ্যতের হাতছানি: এক নতুন কৃষি বিপ্লব
সুব্রত মণ্ডলের এই সাফল্য কেবল তাঁর নিজের ভাগ্যবদল করেনি, বরং গোটা পূর্ব মেদিনীপুরের কৃষকদের মনে এক নতুন আত্মবিশ্বাস জোগাচ্ছে। বহু চাষি এখন তাঁর জমিতে আসছেন এই আধুনিক চাষপদ্ধতি খুঁটিয়ে দেখতে। চলতি বছরের এই বিপুল সাফল্যে উৎসাহিত হয়ে সুব্রতবাবু আগামী বছর থেকে আরও বড় পরিসরে এবং বাণিজ্যিক আকারে এই মরূদ্যানের খেজুর চাষ করার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
সঠিক কৃষি প্রযুক্তি, উপযুক্ত পরিচর্যা এবং সরকারি সহযোগিতা পেলে আগামী দিনে তমলুকের এই মডেল পুরো পশ্চিমবঙ্গে ছড়িয়ে পড়া শুধু সময়ের অপেক্ষা। মরুভূমির ফসলকে বাংলার মাটিতে ‘সোনা’ বানিয়ে সুব্রত মণ্ডল প্রমাণ করে দিলেন—উদ্ভাবনী চিন্তাই পারে কৃষিতে আসল বাজিমাত করতে।





