Mukha:বাঙালি সংস্কৃতির পরতে পরতে লুকিয়ে আছে নানা লোকশিল্প। কিন্তু উত্তরবঙ্গের দিনাজপুরের ‘মুখা’ শিল্প কেবল একটি কারুকার্য নয়, এটি শিল্পীর আত্মনিবেদনের এক পবিত্র অধ্যায়। গগনেন্দ্র শিল্প প্রদর্শশালায় আয়োজিত প্রদর্শনীতে এই শিল্পের গূঢ় রহস্য ও শৈলী সাধারণ মানুষের সামনে উন্মোচিত হয়েছে।

কঠোর সংযম ও নির্মাণের পবিত্রতা
দিনাজপুরের স্থানীয় শিল্পীদের কাছে মুখোশ বা ‘মুখা’ তৈরি করা কোনো সাধারণ পেশা নয়, বরং এটি এক প্রকার উপাসনা। এই শিল্প তৈরির নেপথ্যে রয়েছে কঠোর নিয়মাবলি:
শুদ্ধতা: শিল্পীরা স্নান সেরে, শুদ্ধবস্ত্রে কাজ শুরু করেন।
সংযম: নির্মাণ চলাকালীন শিল্পীরা কঠোর সংযম পালন করেন। মদ্যপান তো বটেই, আমিষ ভোজনও এই সময়ে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
ভক্তি: তাঁদের বিশ্বাস, এই নিষ্ঠা ছাড়া মুখোশে প্রাণের স্পন্দন আনা সম্ভব নয়।
দেশজ উপাদান ও প্রাকৃতিক কারসাজি
এই মুখোশগুলি মূলত দেশি পলি ও রাজবংশী সম্প্রদায়ের কারিগরদের হাতের জাদুতে তৈরি। নির্মাণশৈলীতে ব্যবহার করা হয় সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক উপাদান:
কাঠ: ছাতিম, আম, গামারি, পাকুড় বা নিম গাছের কাঠ ব্যবহার করা হয়।
রঙ: কোনো রাসায়নিক রঙ এখানে ব্রাত্য। সিঁদুর, চুন, সাদা খড়িমাটি এবং বিভিন্ন রঙিন ফুলের নির্যাস দিয়ে তৈরি প্রাকৃতিক রঙেই ফুটে ওঠে শাস্ত্রীয় বা পৌরাণিক চরিত্ররা।
গগনেন্দ্র প্রদর্শশালায় সংস্কৃতির মেলবন্ধন
শিল্পী শর্মিলা সেনের এই আয়োজনে কেবল দিনাজপুরের ‘মুখা’ নয়, বরং বিশ্বজনীন মুখোশ সংস্কৃতির ছোঁয়া পাওয়া যাচ্ছে। এখানে রয়েছে:
দক্ষিণ ভারতের প্রভাব: কথাকলি নৃত্যের শৈলীতে নির্মিত মুখোশ।
আন্তর্জাতিক ছোঁয়া: আফ্রিকার আদিম ও রহস্যময় মুখোশ সংস্কৃতির আদল।
সমন্বয়: শিল্পী শর্মিলার নকশা এবং দক্ষ কারিগরদের হাতের কাজের এক মেলবন্ধন।
অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই
এই প্রদর্শনীর মূল লক্ষ্য কেবল শিল্প প্রদর্শন নয়, বরং একটি অবলুপ্তপ্রায় শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখা। শর্মিলা সেনের মতে, বর্তমান যুগে কারিগররা সঠিক মূল্য ও লাভের মুখ না দেখতে পেয়ে এই কাজ থেকে সরে আসছেন। তিনি মনে করেন, আজকের যুবসমাজের কাছে এই মাটির শিকড়কে পৌঁছে দেওয়া জরুরি। তবেই নতুন প্রজন্ম এই শিল্পকে আপন করে নেবে এবং বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা পাবে বাঙালির এই প্রাচীন ঐতিহ্য।
তথ্যসূত্র: ২০ এপ্রিল পর্যন্ত গগনেন্দ্র শিল্প প্রদর্শশালায় এই প্রদর্শনী জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত। বাংলার লোকসংস্কৃতির এই আধ্যাত্মিক ও শৈল্পিক যাত্রার সাক্ষী থাকতে পারেন আপনিও।
আরও পড়ুন: Rongo, a Heavenly Hill Station: ডুয়ার্সের বুকে এক টুকরো নির্জনতা!!!





