Indian Army Day: ভারতীয় সেনা দিবস (Indian Army Day) প্রতি বছর ১৫ জানুয়ারি সমগ্র ভারতজুড়ে গভীর শ্রদ্ধা, গৌরব ও জাতীয় গর্বের সঙ্গে পালিত হয়। এই দিনটি ভারতীয় সেনাবাহিনীর সাহস, আত্মত্যাগ, শৃঙ্খলা ও অটল দেশপ্রেমকে স্মরণ করার এক গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ। যাঁরা নির্ভীকভাবে সীমান্তে দাঁড়িয়ে দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা করেন, যাঁদের জীবন প্রতিনিয়ত ঝুঁকির মুখে থাকে—এই দিনটি তাঁদের জন্য জাতির পক্ষ থেকে কৃতজ্ঞতা প্রকাশের দিন।
১৯৪৯ সালের ১৫ জানুয়ারি স্বাধীন ভারতের প্রথম ভারতীয় সেনাপ্রধান হিসেবে জেনারেল কে. এম. কারিয়াপ্পা দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ব্রিটিশ শাসনের অবসান ঘটিয়ে ভারতীয় নেতৃত্বের হাতে সম্পূর্ণভাবে সেনাবাহিনীর দায়িত্ব অর্পণের এই ঐতিহাসিক ঘটনাকে স্মরণ করতেই সেনা দিবস পালনের সূচনা। এই দিনটি শুধুমাত্র একটি সামরিক অনুষ্ঠান নয়, এটি জাতীয় আত্মপরিচয়, ঐক্য ও আত্মসম্মানের প্রতীক।
ভারতীয় সেনাবাহিনী কেবল যুদ্ধক্ষেত্রেই নয়, শান্তিকালীন সময়েও দেশের উন্নয়ন, নিরাপত্তা ও মানবিক সেবায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগে উদ্ধারকাজ, জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা অভিযান, অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা—সব ক্ষেত্রেই ভারতীয় সেনার ভূমিকা অনস্বীকার্য।
ভারতীয় সেনা দিবসের ঐতিহাসিক পটভূমি
১৯৪৭ সালে দীর্ঘ স্বাধীনতা সংগ্রামের পর ভারত স্বাধীনতা লাভ করে। স্বাধীনতার সময় ভারতীয় সেনাবাহিনী ছিল ব্রিটিশ নেতৃত্বাধীন, যার প্রধান ছিলেন জেনারেল স্যার ফ্রান্সিস বুচার। যদিও সেনাবাহিনীর বেশিরভাগ সৈন্য ছিলেন ভারতীয়, তবুও সর্বোচ্চ পদে ভারতীয় অফিসারের অনুপস্থিতি ছিল একটি বড় সীমাবদ্ধতা।
১৯৪৯ সালের ১৫ জানুয়ারি জেনারেল বুচার তাঁর দায়িত্ব হস্তান্তর করেন লেফটেন্যান্ট জেনারেল কে. এম. কারিয়াপ্পার হাতে। এই ঘটনাটি স্বাধীন ভারতের সামরিক ইতিহাসে এক যুগান্তকারী অধ্যায়ের সূচনা করে। কারিয়াপ্পা ছিলেন কেবল একজন দক্ষ সেনানায়কই নন, তিনি ছিলেন শৃঙ্খলা, নৈতিকতা ও জাতীয়তাবাদের প্রতীক। তাঁর নেতৃত্বে ভারতীয় সেনাবাহিনী একটি আধুনিক, পেশাদার ও সম্পূর্ণ জাতীয় বাহিনী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।
এই ঐতিহাসিক দিনটিকে স্মরণীয় করে রাখতেই ১৫ জানুয়ারিকে ভারতীয় সেনা দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হয়। প্রতিবছর এই দিনে নয়াদিল্লির কর্তারব্য পথ (পূর্বতন রাজপথ), সেনা সদর দপ্তর ও দেশের বিভিন্ন সেনা ঘাঁটিতে বর্ণাঢ্য কুচকাওয়াজ, সামরিক প্রদর্শনী, শহিদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন ও বীর সেনানীদের সংবর্ধনা অনুষ্ঠিত হয়।
প্রাচীন ভারতের সামরিক ঐতিহ্য
ভারতীয় সেনাবাহিনীর ইতিহাস শুধুমাত্র আধুনিক যুগে সীমাবদ্ধ নয়; এর শিকড় বিস্তৃত প্রাচীন ভারতের সমৃদ্ধ সামরিক ঐতিহ্যের গভীরে। বৈদিক যুগ থেকে শুরু করে মহাকাব্যের যুগ—প্রতিটি পর্বেই সংগঠিত সেনাবাহিনী ও যুদ্ধকৌশলের উল্লেখ পাওয়া যায়।
মহাভারত ও রামায়ণে বিশাল সেনাদল, রথ, অশ্বারোহী ও পদাতিক বাহিনীর বর্ণনা রয়েছে। কুরুক্ষেত্র যুদ্ধ কেবল একটি পৌরাণিক কাহিনি নয়, এটি সেই সময়ের সামরিক সংগঠন ও কৌশলের একটি গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন।
মৌর্য সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য এবং তাঁর পরামর্শদাতা কৌটিল্য (চাণক্য) ভারতের প্রথম সুসংগঠিত সামরিক প্রশাসন গড়ে তোলেন। কৌটিল্যের ‘অর্থশাস্ত্র’-এ সামরিক কৌশল, সেনা ব্যবস্থাপনা, গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক ও যুদ্ধনীতির বিস্তারিত বিবরণ রয়েছে, যা আজও সামরিক গবেষণায় গুরুত্বপূর্ণ।
সম্রাট অশোকের সময়ে সেনাবাহিনী ছিল বিশাল ও শক্তিশালী। কলিঙ্গ যুদ্ধের ভয়াবহতা তাঁকে অহিংসার পথে পরিচালিত করলেও, সামরিক শৃঙ্খলা ও প্রশাসনিক দক্ষতা বজায় ছিল।
পরবর্তীকালে গুপ্ত সাম্রাজ্য, চোল, পাল, রাজপুত ও মারাঠা শক্তিগুলি নিজস্ব সামরিক কাঠামো ও যুদ্ধকৌশলের মাধ্যমে ভারতীয় উপমহাদেশে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে আরও সমৃদ্ধ করে তোলে। শিবাজীর গেরিলা যুদ্ধকৌশল আজও সামরিক ইতিহাসে একটি অনন্য উদাহরণ।
ঔপনিবেশিক যুগ ও ব্রিটিশ ভারতীয় সেনাবাহিনী
ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির আগমনের সঙ্গে সঙ্গে ভারতের সামরিক ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায় শুরু হয়। কোম্পানি প্রথমে বাণিজ্যিক স্বার্থ রক্ষার জন্য সেনাবাহিনী গঠন করলেও, ধীরে ধীরে এটি একটি শক্তিশালী সামরিক বাহিনীতে পরিণত হয়।
ব্রিটিশ ভারতীয় সেনাবাহিনীতে ভারতীয় সৈন্যরা ছিলেন সংখ্যাগরিষ্ঠ, কিন্তু নেতৃত্বের বেশিরভাগ পদে ছিলেন ব্রিটিশ অফিসাররা। তবুও ভারতীয় সৈন্যদের সাহস, শৃঙ্খলা ও যুদ্ধদক্ষতা বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে স্বীকৃতি লাভ করে।
১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহ ভারতীয় সেনা ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ মোড়। এটি কেবল একটি বিদ্রোহ নয়, বরং ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে ভারতীয় সৈন্যদের প্রথম সংগঠিত প্রতিরোধ। এই বিদ্রোহের পর ব্রিটিশরা সেনাবাহিনীর কাঠামোতে ব্যাপক পরিবর্তন আনে, কিন্তু ভারতীয় সৈন্যদের আত্মত্যাগ ইতিহাসে অমর হয়ে থাকে।
স্বাধীনতা সংগ্রাম ও আজাদ হিন্দ ফৌজ
ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে সেনাবাহিনীর ভূমিকা বহুমাত্রিক। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর নেতৃত্বে আজাদ হিন্দ ফৌজ গঠিত হয়। “তোমরা আমাকে রক্ত দাও, আমি তোমাদের স্বাধীনতা দেব”—এই আহ্বান ভারতীয় যুবসমাজ ও সৈন্যদের মধ্যে বিপুল উদ্দীপনা সৃষ্টি করে।
আজাদ হিন্দ ফৌজ সরাসরি সামরিকভাবে ব্রিটিশ শাসন উৎখাত করতে না পারলেও, এর প্রভাব ছিল সুদূরপ্রসারী। আজাদ হিন্দ ফৌজের বিচার ভারতীয় সমাজে দেশপ্রেমের আগুন জ্বালিয়ে দেয় এবং স্বাধীনতার পথকে ত্বরান্বিত করে।
স্বাধীনতার পর ভারতীয় সেনাবাহিনীর যাত্রা
স্বাধীনতার পর ভারতীয় সেনাবাহিনীর সামনে একাধিক কঠিন চ্যালেঞ্জ উপস্থিত হয়। দেশভাগজনিত অস্থিরতা, শরণার্থী সমস্যা ও সীমান্ত বিরোধ সেনাবাহিনীর জন্য প্রথম বড় পরীক্ষা ছিল।
১৯৪৭–৪৮ কাশ্মীর যুদ্ধ
এই যুদ্ধ নবগঠিত ভারতীয় সেনাবাহিনীর সাহস ও সক্ষমতার প্রমাণ দেয়। সীমিত সম্পদ সত্ত্বেও সেনাবাহিনী কৌশলগত দক্ষতার সঙ্গে পরিস্থিতি মোকাবিলা করে।
১৯৬২ সালের চীন যুদ্ধ
এই যুদ্ধ ভারতীয় সেনাবাহিনীর জন্য একটি কঠিন অভিজ্ঞতা ছিল। এই যুদ্ধ থেকে শিক্ষা নিয়ে সেনাবাহিনীর আধুনিকীকরণ ও পরিকাঠামো উন্নয়নের দিকে জোর দেওয়া হয়।
১৯৬৫ ও ১৯৭১ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ
১৯৭১ সালের যুদ্ধে ভারতীয় সেনাবাহিনীর ঐতিহাসিক বিজয় এবং বাংলাদেশের মুক্তি দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে।
সংগঠন, শৃঙ্খলা ও নীতি
ভারতীয় সেনাবাহিনী বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ স্বেচ্ছাসেবী সেনাবাহিনী। এটি বিভিন্ন কমান্ড, কর্পস, ডিভিশন ও ব্রিগেডে বিভক্ত। পদাতিক, সাঁজোয়া বাহিনী, আর্টিলারি, ইঞ্জিনিয়ার্স, সিগন্যালস, মেডিক্যাল কোর ও বিশেষ বাহিনী—প্রতিটি শাখা নিজ নিজ ক্ষেত্রে দক্ষ।
সেনাবাহিনীর মূল আদর্শ—“সেবা পরমো ধর্মঃ”—প্রতিটি সেনাসদস্যকে কর্তব্যনিষ্ঠা ও আত্মত্যাগে উদ্বুদ্ধ করে।
আধুনিকীকরণ ও প্রযুক্তিগত অগ্রগতি
বর্তমান বিশ্বে যুদ্ধের ধরন দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। এই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ভারতীয় সেনাবাহিনী আধুনিক প্রযুক্তি গ্রহণ করছে। উন্নত ট্যাংক, আর্টিলারি, ড্রোন, সাইবার ও মহাকাশভিত্তিক সক্ষমতা সেনাবাহিনীকে আরও শক্তিশালী করেছে।
দেশীয় প্রতিরক্ষা উৎপাদন, “মেক ইন ইন্ডিয়া” ও আত্মনির্ভর ভারত উদ্যোগ সেনাবাহিনীকে প্রযুক্তিগতভাবে স্বনির্ভর করে তুলছে।
শান্তিরক্ষা ও মানবিক ভূমিকা
ভারতীয় সেনাবাহিনী জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা অভিযানে বিশ্বে অন্যতম বৃহৎ অবদানকারী। আফ্রিকা ও এশিয়ার বিভিন্ন সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে ভারতীয় শান্তিরক্ষীরা সাহস ও মানবিকতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।
দেশের অভ্যন্তরে বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, ভূমিকম্প ও অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগে সেনাবাহিনীর উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবন রক্ষা করেছে।
সেনা দিবসের তাৎপর্য ও ভবিষ্যৎ প্রজন্ম
ভারতীয় সেনা দিবস আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা সহজে অর্জিত হয়নি। অসংখ্য শহিদের আত্মত্যাগ ও সেনানীদের নিরলস পরিশ্রমের ফলেই আজ আমরা নিরাপদ ও স্বাধীন। এই দিনটি নতুন প্রজন্মকে দেশপ্রেম, শৃঙ্খলা ও দায়িত্ববোধে উদ্বুদ্ধ করে।
ভারতীয় সেনা দিবস কেবল একটি আনুষ্ঠানিক দিবস নয়; এটি জাতির কৃতজ্ঞতার প্রকাশ। ভারতীয় সেনাবাহিনীর ইতিহাস সাহস, ত্যাগ, শৃঙ্খলা ও অদম্য সংকল্পের ইতিহাস। অতীতের গৌরবময় অধ্যায় থেকে শিক্ষা নিয়ে আধুনিক প্রযুক্তি ও মানবিক মূল্যবোধের সমন্বয়ে ভারতীয় সেনাবাহিনী ভবিষ্যতেও দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও সম্মান রক্ষায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করবে।
ভারতীয় সেনাদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে বলা যায়—তাঁরাই আমাদের শান্তির প্রহরী, স্বাধীনতার রক্ষাকবচ এবং জাতির অমলিন গর্ব।
আরও পড়ুন: আলোকা দ্য পিস ডগ: নিঃশব্দ ভালোবাসায় গড়া এক শান্তির ইতিহাস





