Subha Nababarsha: লক্ষ্মী-গণেশ পূজার মাহাত্ম্য ও বঙ্গাব্দের ইতিহাস!!!
বাঙালির বারো মাসে তেরো পার্বণ, যার সূচনা হয় বৈশাখের এই পুণ্য তিথিতে। ব্যবসায়ীদের ‘হালখাতা’ থেকে শুরু করে গৃহস্থের অন্দরমহল—সর্বত্রই বিরাজ করেন লক্ষ্মী ও গণেশ।
১. কেন লক্ষ্মী ও গণেশের যুগল পূজা?
হিন্দু শাস্ত্র মতে, যেকোনো শুভ কাজের শুরুতে গণেশ পূজা আবশ্যিক। ডঃ জয়ন্ত কুশারীর মতে, এর পেছনে গভীর আধ্যাত্মিক ও ব্যবহারিক কারণ রয়েছে:
বিঘ্নহর্তা গণেশ: গণেশ হলেন বুদ্ধির দেবতা এবং সকল বাধা দূরকারী (বিঘ্নহর্তা)। নতুন বছরে যেন কোনো বিপত্তি না আসে এবং শিক্ষা বা ব্যবসায় যেন সাফল্য আসে, তাই গণেশকে আহ্বান জানানো হয়।
ধনদাত্রী লক্ষ্মী: যেকোনো কাজ পরিচালনা করতে অর্থের প্রয়োজন। দেবী লক্ষ্মী হলেন শ্রী ও সমৃদ্ধির প্রতীক।
সিদ্ধি ও সমৃদ্ধির মিলন: শাস্ত্রীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, কেবল জ্ঞান (গণেশ) থাকলে চলে না, তা প্রয়োগের জন্য সম্পদের (লক্ষ্মী) প্রয়োজন। আবার সম্পদ থাকলেও যদি সুবুদ্ধি না থাকে, তবে তা বিনাশ হয়। তাই জীবনকে ভারসাম্যপূর্ণ করতে এই দুই দেবতার আরাধনা করা হয়।
২. শাস্ত্রীয় বিধি ও মন্ত্রের গুরুত্ব:
শ্রীগণেশ দ্বাদশ নাম স্তোত্র অনুযায়ী— “বিদ্যারম্ভে বিবাহে চ প্রবেশে নির্গমে তথা”। অর্থাৎ বিদ্যালাভ, বিবাহ, গৃহপ্রবেশ বা নতুন যাত্রার শুরুতে গণেশ স্মরণ আবশ্যিক। অন্যদিকে, নতুন বছরে সংসারের শ্রীবৃদ্ধি কামনায় মন্ত্রোচ্চারণের মাধ্যমে মা লক্ষ্মীকে আবাহন করা হয়, যাতে সারা বছর অন্ন-বস্ত্রের অভাব না ঘটে।
৩. নববর্ষের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট:
বাংলা সনের প্রবর্তন নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে ভিন্ন ভিন্ন মত থাকলেও প্রধানত দুটি তত্ত্ব প্রচলিত:
রাজা শশাঙ্কের অবদান: অনেক ঐতিহাসিকের মতে, সপ্তম শতাব্দীতে গৌড়রাজ শশাঙ্ক প্রথম এই সনের সূচনা করেন। বঙ্গাব্দের গণনা শশাঙ্কের রাজ্যাভিষেক থেকেই শুরু হয়েছিল বলে মনে করা হয়।
সম্রাট আকবরের সংস্কার: মুঘল আমলে হিজরি সন অনুযায়ী খাজনা আদায় করা হতো। কিন্তু চন্দ্র মাস এবং সৌর মাসের পার্থক্যের কারণে কৃষকদের কর দিতে সমস্যা হতো। এই সমস্যা সমাধানে সম্রাট আকবর তাঁর রাজজ্যোতিষী ফতেহউল্লাহ সিরাজীর পরামর্শে ‘ফসলি সন’ প্রবর্তন করেন, যা আজকের পরিচিত বঙ্গাব্দ।
৪. অগ্রহায়ণ থেকে বৈশাখ: সনের বিবর্তন:
আগে অগ্রহায়ণ মাসকে বছরের শুরু ধরা হতো। ‘অঘ্রাণ’ শব্দের ব্যুৎপত্তিগত অর্থ হলো বছরের শুরু (অগ্র = আগে, হায়ণ = বছর)। শ্রীমদ্ভগবদ্গীতায় শ্রীকৃষ্ণ নিজেকে মাসগুলোর মধ্যে ‘মার্গশীর্ষ’ বা অগ্রহায়ণ বলে উল্লেখ করেছেন। তবে কৃষিভিত্তিক সমাজ এবং কর আদায়ের সুবিধার্থে পরবর্তীকালে বৈশাখ মাসকেই নববর্ষের প্রারম্ভ হিসেবে গ্রহণ করা হয়।
৫. বাঙালির জীবনে হালখাতা ও নতুন সংকল্প:
ব্যবসায়ীদের কাছে পয়লা বৈশাখ মানেই ‘হালখাতা’। পুরনো বছরের সব দেনা-পাওনা মিটিয়ে লাল কাপড়ে মোড়া নতুন খাতায় হিসাব শুরু করা হয়। এটি কেবল বাণিজ্যিক লেনদেন নয়, বরং পারস্পরিক সম্পর্ক পুনর্নবীকরণের একটি সামাজিক উৎসবও বটে।
উপসংহার
পয়লা বৈশাখ আমাদের শেখায় জীর্ণতাকে বিদায় জানিয়ে নতুনের জয়গান গাইতে। লক্ষ্মী-গণেশের আরাধনার মাধ্যমে বাঙালি মূলত সুখ, শান্তি, সমৃদ্ধি এবং শুভবুদ্ধির প্রার্থনা করে। জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে এই দিনটি বাঙালির একত্বের প্রতীক হয়ে চিরকাল অম্লান থাকুক।
শুভ নববর্ষ ১৪৩৩!
আরও পড়ুন:flight of spirits: ট্রাক চালকের মেয়ে এখন ইউপিএসসি বিজয়ী!!!





