A Pond of Hope: জঙ্গলমহল পুরুলিয়া, যেখানে ছোটনাগপুর মালভূমির রুক্ষ প্রকৃতি আর জনজাতি জীবনের সংগ্রাম একে অপরের পরিপূরক। এই প্রতিকূলতার মাঝেই এক ব্যতিক্রমী উদ্যোগের আলো জ্বেলেছে মানবাজার এক ব্লকের গোবিন্দপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়। শুধুমাত্র পুঁথিগত শিক্ষায় আটকে না থেকে, এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি পড়ুয়াদের মিড-ডে মিলের পুষ্টি নিশ্চিত করতে এবং স্থানীয় জনজাতি মহিলাদের স্বনির্ভর করতে এক যুগান্তকারী মৎস্য প্রকল্প গ্রহণ করেছে।
উদ্যোগের দ্বৈত লক্ষ্য
এই প্রকল্পের প্রধান লক্ষ্য দুটি:
১. পুষ্টি সমাধান: প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পড়ুয়ারা যাতে মিড-ডে মিলে টাটকা ও পুষ্টিকর মাছ পায়, তা নিশ্চিত করা।
২. মহিলাদের ক্ষমতায়ন: এলাকার পিছিয়ে পড়া জনজাতি মহিলাদের মাছ চাষের মাধ্যমে আয়ের পথ খুলে দেওয়া, যা তাঁদের আর্থ-সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধি করবে।
এই সামাজিক উদ্যোগ বাস্তবায়নে গোবিন্দপুর প্রাথমিক বিদ্যালয় হাত মিলিয়েছে ব্যারাকপুরের ‘আইসিএআর-সেন্ট্রাল ইনল্যান্ড ফিশারিজ রিসার্চ ইনস্টিটিউট’ (ICAR-CIFRI) এবং একটি বেসরকারি সংস্থার সঙ্গে।
প্রকল্পের রূপরেখা ও বাস্তবায়ন
এই প্রকল্পের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে স্থানীয় মহিলাদের সক্রিয় অংশগ্রহণ। পুষ্ণা ও মানবাজার এক ব্লকের মোট ৪৮টি মহিলা স্বনির্ভর গোষ্ঠীকে এই কাজে যুক্ত করা হয়েছে।
পরিকাঠামো: মোট ১৬টি বাঁধে প্রায় ১৪০ একর জলাশয় জুড়ে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে মাছ চাষ শুরু হয়েছে।
সহায়তা: আইসিএআর-সিআইএফআরআই-এর পক্ষ থেকে ১,৬০০ কেজি মাছের পোনা, ১৬ টন মাছের খাবার, নৌকা, জাল ও মাছ চাষের অন্যান্য প্রয়োজনীয় উপকরণ সরবরাহ করা হয়েছে।
প্রশিক্ষণ: শুধু উপকরণ দেওয়াই নয়, মহিলাদের মাছ চাষের পদ্ধতি, মাছকে খাবার দেওয়া, জলের গুণমান পরীক্ষা ও রক্ষণাবেক্ষণ বিষয়ে সম্পূর্ণ হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি, তাঁদের আত্মনির্ভরতা বাড়াতে নিয়মিত সচেতনতামূলক শিবিরও করা হচ্ছে।
পুষ্টি ও আয়ের মেলবন্ধন
প্রকল্পটির সাফল্য নিশ্চিত করতে একটি সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। গোবিন্দপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক অমিতাভ মিশ্র জানান, এই প্রকল্প থেকে উৎপাদিত মোট মাছের ৫০ শতাংশ স্থানীয় প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলিকে দেওয়া হবে। এই মাছ সরাসরি পড়ুয়াদের মিড-ডে মিলের পাতে পৌঁছবে, যা তাদের পুষ্টির ঘাটতি মেটাতে সাহায্য করবে।
রাজ্যের পশ্চিমাঞ্চল উন্নয়ন বিভাগের স্বাধীন দায়িত্বপ্রাপ্ত রাষ্ট্রমন্ত্রী সন্ধ্যারানি টুডু এই উদ্যোগের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। তিনি বলেন, “এই কাজের মাধ্যমে স্কুল পড়ুয়ারা যেমন যথাযথ পুষ্টি পাবে, তেমনই জনজাতির মহিলাদের আর্থ-সামাজিক অবস্থারও দ্রুত উন্নয়ন ঘটবে।”
আয়ের বিকল্প পথ: রঙিন মাছ চাষ
মূল মৎস্য প্রকল্পের পাশাপাশি, মহিলাদের জন্য ঘরোয়া আয়ের এক নতুন দিক খুলে দিতে রঙিন মাছ চাষের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। এই প্রকল্পের অধীনে গোবিন্দপুরে এফআরপি ট্যাঙ্ক, অ্যারেটর, ফিড এবং দেশীয় রঙিন মাছ বিতরণ করা হয়েছে। এটি মহিলাদের বাড়িতে বসেই অতিরিক্ত আয়ের সুযোগ করে দেবে।
সিফরির অধিকর্তা ড. বসন্তকুমার দাস এই প্রকল্পের গুরুত্ব ব্যাখ্যা করে বলেন, “এই প্রকল্পের মাধ্যমে দুটি কাজ একযোগে হচ্ছে, যা এর প্রধান বৈশিষ্ট্য। মহিলাদের মৎস্য চাষে যুক্ত করা কেবল তাঁদের আয় বৃদ্ধি নয়, এই উদ্যোগের ফলে প্রায় ৫৩১টি অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল জনজাতি পরিবার সরাসরি উপকৃত হবে।” এই পদক্ষেপ পুরুলিয়ায় এক টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক গ্রামীণ রূপান্তরের পথ প্রশস্ত করবে বলেই আশা করা হচ্ছে।
আরও পড়ুন: ভুঁড়ি কমাতে ও হাঁটুর ব্যথা সারাতে সমাধান: তির্যক চক্রাসন





