Homeব্লগMelody Queen Asha Bhosle: এক কালজয়ী জীবন!!!

Melody Queen Asha Bhosle: এক কালজয়ী জীবন!!!

Melody Queen Asha Bhosle: এক কালজয়ী জীবন!!!

ভারতীয় সংগীতের আকাশ থেকে একটি উজ্জ্বল নক্ষত্র খসে পড়ল। গত ১২ই এপ্রিল মুম্বাইয়ের ব্রিচ ক্যান্ডি হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন সুরসম্রাজ্ঞী আশা ভোঁসলে। তাঁর প্রয়াণে কেবল একটি কণ্ঠ স্তব্ধ হয়নি, বরং ভারতীয় সংগীতের আট দশকের এক গৌরবময় অধ্যায়ের অবসান ঘটেছে। বার্ধক্যজনিত অসুস্থতা এবং শেষ পর্যন্ত মাল্টি-অর্গান ফেইলিউরের কাছে হার মেনে ৯২ বছর বয়সে তিনি পাড়ি জমালেন অমৃতলোকে।

১. শোকাতুর জাতি: একটি নক্ষত্রের বিদায়

আশা তাই-এর প্রয়াণে সমগ্র ভারত আজ শোকাচ্ছন্ন। তাঁর মৃত্যুসংবাদ ছড়িয়ে পড়ার সাথে সাথেই রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর শোকবার্তা থেকে শুরু করে বিনোদন ও রাজনৈতিক জগতের বিশিষ্ট ব্যক্তিদের শ্রদ্ধাঞ্জলিতে ভরে উঠেছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম। মুম্বাইয়ের শিবাজি পার্কে যখন পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তাঁর শেষকৃত্য সম্পন্ন হচ্ছিল, তখন সেখানে উপস্থিত হাজারো মানুষের চোখ ছিল অশ্রুসজল। সুরের মায়া কাটিয়ে শরীরী প্রস্থান ঘটলেও তিনি রেখে গেছেন তাঁর অমর সৃষ্টি, যা চিরকাল সংগীতপ্রেমীদের হৃদয়ে অনুরণিত হবে।


২. সংগীত জীবনের ব্যাপ্তি ও বৈচিত্র্য: অপ্রতিদ্বন্দ্বী এক সত্তা

আশা ভোঁসলের সংগীত জীবনের মূল স্তম্ভ ছিল তাঁর অভাবনীয় বৈচিত্র্য। দিদি লতা মঙ্গেশকর যখন তাঁর স্নিগ্ধ ও ধ্রুপদী কণ্ঠ দিয়ে ভারতের হৃদয় জয় করেছিলেন, তখন আশা নিজের জায়গা তৈরি করেছিলেন বৈচিত্র্য আর সাহসিকতায়।

  • বিশাল ভাণ্ডার: তিনি ২০টিরও বেশি ভাষায় ১২,৫০০-এর বেশি গান রেকর্ড করেছেন। গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস (২০১১) তাকে সংগীত ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি গান রেকর্ড করার স্বীকৃতি দিয়েছে।

  • ঘরানার জাদুকর: ক্ল্যাসিক্যাল থেকে শুরু করে গজল, পপ, ক্যাবারে বা লোকসংগীত—সবক্ষেত্রেই তাঁর অবাধ বিচরণ ছিল। যখন তিনি ‘দম মারো দম’ গেয়েছেন, তখন যুবসমাজ উদ্বেলিত হয়েছে; আবার যখন তিনি ‘দিল চিজ কেয়া হ্যায়’-এর মতো ধ্রুপদী ঘরানার গজল গেয়েছেন, তখন সংগীত সমালোচকরাও স্তব্ধ হয়ে গেছেন।

  • কণ্ঠের নমনীয়তা: তাঁর কণ্ঠের বিশেষত্ব ছিল এর তারুণ্য। সত্তর-আশি বছর বয়সেও তাঁর কণ্ঠে যে তেজ এবং লাবণ্য ছিল, তা বিস্ময়কর।


৩. সংগ্রামের মাধ্যমে উত্তরণ: লতার ছায়া থেকে নিজের আকাশ

আশা ভোঁসলের জীবন কেবল সাফল্যের নয়, বরং কঠোর সংগ্রামের গল্প। দিদি লতা মঙ্গেশকরের মহীরুহসম ছায়া থেকে বেরিয়ে নিজের এক স্বতন্ত্র পরিচয় তৈরি করা মোটেও সহজ ছিল না। শুরুর দিকে তাকে এমন সব গান দেওয়া হতো যা অন্য কেউ গাইতে চাইতেন না। কিন্তু সেই প্রতিকূলতাকেই তিনি সুযোগে পরিণত করেছিলেন।

ব্যক্তিগত জীবনেও তিনি কম চড়াই-উতরাই দেখেননি। খুব কম বয়সে বিয়ে, পরবর্তীতে পারিবারিক টানাপোড়েন এবং সন্তানদের বড় করার লড়াই—সব মিলিয়ে তিনি ছিলেন এক “সারভাইভার”। ওপি নাইয়ার থেকে আরডি বর্মন—সংগীত পরিচালকদের সাথে তাঁর রসায়ন ভারতীয় চলচ্চিত্রে নতুন ধারা তৈরি করেছিল। বিশেষ করে আরডি বর্মনের সাথে তাঁর জুটি সংগীত জগতকে আধুনিকতার এক নতুন শিখরে নিয়ে গিয়েছিল।


৪. অর্জনের মুকুটে অসংখ্য পালক

তাঁর দীর্ঘ ও বর্ণাঢ্য কর্মজীবনে তিনি অসংখ্য সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন, যা তাঁর শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ দেয়:

সম্মাননার নামবছরবিবরণ
দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কার২০০০ভারতীয় চলচ্চিত্রের সর্বোচ্চ সম্মান।
পদ্মবিভূষণ২০০৮ভারতের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মান।
গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস২০১১সংগীত ইতিহাসে সর্বাধিক গান রেকর্ডিংয়ের জন্য।
বঙ্গবিভূষণ২০১৮পশ্চিমবঙ্গ সরকার কর্তৃক প্রদত্ত বিশেষ সম্মান।
জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার২ বার (উমরাও জান ও ইজাজত ছবির জন্য)।
ফিল্মফেয়ার অ্যাওয়ার্ডসমোট ৯টি (লাইফটাইম অ্যাচিভমেন্টসহ)।

৫. কালজয়ী গান: যা আজও মানুষের মুখে মুখে

আশা ভোঁসলের গান ছাড়া ভারতীয় চলচ্চিত্র অসম্পূর্ণ। তাঁর অসংখ্য কালজয়ী গানের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কিছু হলো:

  1. রোমান্টিক: “চুরা লিয়া হ্যায় তুমনে জো দিল কো”

  2. গজল: “ইন আঁখো কি মাস্তি কে”, “ইয়ে কেয়া জাগাহ হ্যায় দোস্তো”

  3. ডান্স নাম্বার: “পিয়া তু আব তো আজা”, “ও হাসিনা জুলফੋਂ ওয়ালি”

  4. ক্ল্যাসিক্যাল ও সেমি-ক্ল্যাসিক্যাল: “খালি হাত আয়ে থে” (ইজাজত)

বাংলা গানেও তাঁর অবদান অনস্বীকার্য। “এবারের মতো বিদায় দাও মা”, “চোখে চোখে কথা বলো” কিংবা “মনে পড়ে রুবি রায়”—এমন অসংখ্য বাংলা গান বাঙালির ড্রয়িংরুম থেকে শুরু করে পুজোর প্যান্ডেলে আজও অমলিন।


৬. উত্তরাধিকার ও শেষ বিদায়

আশা ভোঁসলে কেবল একজন গায়িকা ছিলেন না, তিনি ছিলেন এক জীবনবোধের প্রতীক। জীবনের কঠিনতম সময়েও তিনি হাসি ধরে রেখেছিলেন। তাঁর রন্ধনশিল্পের প্রতি ভালোবাসা এবং তাঁর রেস্টুরেন্ট চেইন ‘আশাস’ প্রমাণ করে যে জীবনের প্রতি তাঁর আগ্রহ ছিল বহুমুখী।

মুম্বাইয়ের শিবাজি পার্কে তাঁর শেষ বিদায়ে সমগ্র জাতি অবনত মস্তকে কৃতজ্ঞতা জানিয়েছে। শরীরী প্রস্থান ঘটলেও আশা তাই অমর তাঁর গানে। “সুরের কোনো সীমানা নেই, আর আশা তাই ছিলেন সেই সুরের এক মুক্ত আকাশ।”

“তিনি চলে গেছেন কিন্তু তাঁর কণ্ঠের মাদকতা রয়ে গেছে বাতাসের প্রতিটি কম্পনে। যতদিন সুর থাকবে, তালি থাকবে আর সংগীতপ্রেমী মানুষ থাকবে—ততদিন আশা ভোঁসলে থাকবেন আমাদের মাঝে।”


উপসংহার: আশা ভোঁসলে একটি নাম নয়, একটি প্রতিষ্ঠান। আটটি দশক ধরে তিনি যেভাবে কণ্ঠ দিয়ে মানুষের আবেগ নিয়ন্ত্রণ করেছেন, তা বিশ্ব সংগীতে বিরল। তাঁর প্রয়াণে ভারতীয় সংস্কৃতিতে যে শূন্যতা তৈরি হলো, তা কোনোদিন পূরণ হওয়ার নয়। বিদায়, হে সুরের জাদুকরী! আপনার সুরের মায়ায় আমরা আজীবন ঋণী থাকব।

আরও পড়ুন:Burdwan’s glorious achievement in the field of science: প্রফেসর অশোক ঘোষ মেমোরিয়াল গোল্ড মেডেল পেলেন ড. সুমিত কুমার হীরা!!!

Join Our WhatsApp Group For New Update
RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

spot_img

সবচেয়ে জনপ্রিয়