History unearthed: পূর্ব বর্ধমানের রায়নার শান্ত জনপদ পলাসন গ্রাম এখন ইতিহাসের চর্চার কেন্দ্রে। সম্প্রতি গ্রামের একটি মজে যাওয়া পুকুর সংস্কার করতে গিয়ে মাটির গভীর থেকে উঠে এসেছে প্রায় এক হাজার বছরের প্রাচীন একটি বিষ্ণুমূর্তি। কষ্টিপাথরের তৈরি এই মহামূল্যবান নিদর্শনটি সেন আমলের শিল্পকলার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
যেভাবে উদ্ধার হলো এই পুরাকীর্তি
ঘটনাটি ঘটেছে রায়নার পলাসন গ্রামের সাঁইপাড়ার ‘বাসাপুকুর’ এলাকায়। পুকুরটি দীর্ঘদিন ধরে মজে থাকায় সেটি সংস্কারের সিদ্ধান্ত নেন মালিক। কয়েকদিন আগে জেসিবি মেশিন দিয়ে পুকুরের মাটি ও পাঁক তোলার কাজ শুরু হয়। মাটি খনন করার সময় হঠাৎই যন্ত্রের ডগায় উঠে আসে কালো পাথরের একটি বিশালাকার মূর্তি। মুহূর্তের মধ্যে এই খবর ছড়িয়ে পড়ে এবং এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়।
মূর্তির শৈল্পিক ও ঐতিহাসিক গুরুত্ব
ইতিহাসবিদ ও বিশেষজ্ঞদের মতে, উদ্ধার হওয়া মূর্তিটি একাদশ-দ্বাদশ শতকের (সেন আমল)। মূর্তিটির গঠনশৈলী অত্যন্ত নিখুঁত এবং শাস্ত্রীয়। বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগ্রহশালার প্রাক্তন কিউরেটর ড. রঙ্গনকান্তি জানা মূর্তিটির বৈশিষ্ট্য ব্যাখ্যা করে জানিয়েছেন:
চতুর্ভুজ রূপ: ভগবান বিষ্ণুর চার হাতে রয়েছে শঙ্খ, চক্র, গদা ও পদ্ম।
পার্শ্বদেবতা: মূর্তির দুই পাশে অধিষ্ঠিত রয়েছেন দেবী লক্ষ্মী ও সরস্বতী।
উপাদান: মূর্তিটি উন্নতমানের কালো কষ্টিপাথরের তৈরি।
পরিমাপ: এর উচ্চতা ৩৩ ইঞ্চি এবং প্রস্থ ১৩ ইঞ্চি।
গবেষকদের মতে, রায়নার এই বিস্তীর্ণ অঞ্চলে প্রাচীনকালে যে বিষ্ণু উপাসনার ব্যাপক প্রচলন ছিল, এই আবিষ্কার তারই বলিষ্ঠ প্রমাণ।
বর্তমান অবস্থা ও সরকারি পদক্ষেপ
মূর্তিটি উদ্ধারের পর প্রাথমিক পর্যায়ে মালিকানা নিয়ে কিছুটা স্থানীয় টানাপোড়েন তৈরি হলেও, রায়না থানার পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। বর্তমানে মূর্তিটি বৈজ্ঞানিক সংরক্ষণ ও গবেষণার জন্য বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগ্রহশালায় (Museum) স্থানান্তরিত করা হয়েছে।
তবে আক্ষেপের বিষয় হলো, পুকুর খনন করার সময় যন্ত্রের (JCB) আঘাতে মূর্তিটি কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিশেষ করে মূর্তির বাঁ দিকের অংশ, নাক এবং বাঁ চোখ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানিয়েছেন মিউজিয়ামের কর্মীরা।
বর্ধমানের মাটির নিচে লুকানো ইতিহাস
এটিই প্রথম নয়; গত বছরও রায়না এলাকা থেকে সমসাময়িক দুটি প্রাচীন মূর্তি উদ্ধার করা হয়েছিল। প্রত্নতাত্ত্বিকদের মতে, পাল ও সেন যুগে বাংলার শিল্পকলা ও ধর্মীয় ঐতিহ্যের যে স্বর্ণযুগ ছিল, এই মূর্তিটি সেই ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ যোগসূত্র। এই আবিষ্কার ওই অঞ্চলের প্রাচীন জনবসতি ও সংস্কৃতি নিয়ে নতুন করে গবেষণার পথ খুলে দিল।
আরও পড়ুন: গুলকন্দ: ত্বকের প্রাকৃতিক জেল্লা ফেরাতে এক জাদুকরী আয়ুর্বেদিক দাওয়াই





