Cultivating Gold: মেদিনীপুরের জঙ্গলমহল বলতেই একসময় চোখের সামনে ভেসে উঠত রুক্ষ, লাল মাটি আর অনুর্বর প্রান্তর। কিন্তু সেই চেনা ছবিটাই বদলে দিয়েছেন মেদিনীপুরের বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন সেবাভারতী মহাবিদ্যালয়ের অধ্যাপক প্রশান্তকুমার দাস। তাঁর হাত ধরে জঙ্গলমহলের অনুর্বর মাটিতে এখন ফলছে রকমারি বিদেশি ফল, যা স্থানীয় যুবকদের দেখাচ্ছে আয়ের নতুন দিশা।
স্বপ্নের বাগান: ‘ফরেস্ট পার্ক’
মেদিনীপুর সদর পঞ্চায়েত সমিতির সহযোগিতায় দেলুয়া এলাকায় ১৪ একর জমি লিজ নিয়ে প্রশান্তবাবু গড়ে তুলেছেন ‘ফরেস্ট পার্ক’। এটি কেবল একটি বাগান নয়, বরং সমন্বিত কৃষি ও উদ্যানপালন (Integrated Agriculture & Horticulture) প্রকল্পের এক জীবন্ত গবেষণাগার।
এই বাগানের বিশেষ আকর্ষণ হলো ‘ভারতসুন্দরী কুল’, যা সাধারণ মানুষের কাছে ‘আপেল-কুল’ নামেই পরিচিত। দেখতে ছোট আপেলের মতো এই কুলের চাহিদা এখন তুঙ্গে। অধ্যাপক দাসের তত্ত্বাবধানে ৫ বিঘা জমিতে এই কুলের ব্যাপক চাষ হচ্ছে।
শীতেও মিলছে আম ও বিদেশি ফল
সাধারণত আম গ্রীষ্মকালীন ফল হলেও, প্রশান্তবাবুর বাগানে শীতের আমেজেই ডাল ভরে রয়েছে ‘কাটিমন’ আমে। সারাবছর ফলন দেওয়া এই আম ছাড়াও গত মরশুমে তিনি ফলিয়েছেন বিশ্বের সবচেয়ে দামি আম মিয়াজাকি, পাশাপাশি রেড পালমার ও রেড আইভরির মতো মূল্যবান প্রজাতি।
বর্তমানে এই বাগানে কুল ও আমের পাশাপাশি রয়েছে:
পেঁপে ও পেয়ারা: বাণিজ্যিক ভাবে সফল চাষ।
ফুলের বাগান: নানারকম রঙিন ফুলের সমারোহ।
জৈব চাষ: পুরো প্রকল্পেই রাসায়নিক সারের বদলে ব্যবহার করা হয়েছে সম্পূর্ণ জৈব সার।
আয়ের নতুন সমীকরণ
অধ্যাপক প্রশান্তকুমার দাসের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এই বিকল্প চাষ অত্যন্ত লাভজনক:
খরচ: ৫ বিঘা জমিতে আপেল-কুল চাষে খরচ হয়েছে প্রায় ১ লক্ষ ২০ হাজার টাকা (বিঘা প্রতি প্রায় ২৪-২৫ হাজার টাকা)।
লাভের অঙ্ক: বিঘা প্রতি প্রায় ১ লক্ষ টাকা লাভ করা সম্ভব।
সাফল্য: ইতিমিধ্যেই কয়েক লক্ষ টাকার কুল বিক্রি হয়েছে এবং আগামী কয়েক মাসে আরও বড় অঙ্কের বিক্রির সম্ভাবনা রয়েছে।
“জঙ্গলমহলের তরুণ প্রজন্মকে বিকল্প আয়ের পথ দেখাতেই আমরা ‘সৃজনী এগ্রো ফাউন্ডেশন’ গড়ে তুলেছি। রুক্ষ মাটিতেও জৈব সার ব্যবহার করে যে লক্ষ লক্ষ টাকা আয় করা সম্ভব, তা আমরা প্রমাণ করতে চেয়েছি।” — প্রশান্তকুমার দাস
কর্মসংস্থান ও আগামীর পথ
এই উদ্যোগকে সাধুবাদ জানিয়েছেন মেদিনীপুর সদর পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতি উর্মিলা সাউ। তিনি জানান, এই প্রকল্পের মাধ্যমে বহু মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে এবং এলাকার বেকার যুবকরা স্বনির্ভর হওয়ার উৎসাহ পাচ্ছেন। যে কোনো উৎসাহী যুবক বা সংস্থা যদি এই ধরণের আধুনিক চাষে আগ্রহী হন, তবে ‘সৃজনী এগ্রো ফাউন্ডেশন’ সবরকম কারিগরি সহায়তার আশ্বাস দিয়েছে।
অধ্যাপক দাসের এই ‘মডেল ফার্ম’ প্রমাণ করে দিল যে, ইচ্ছাশক্তি আর সঠিক পরিকল্পনা থাকলে রুক্ষ মাটিকেও সোনা ফালানো জমিতে পরিণত করা সম্ভব।
আরও পড়ুন: এক পৃথিবী, বহু সময়: কেন একসঙ্গে শুরু হয় না নববর্ষ





