India’s First Signal-Free City: ভারতের শহরগুলোর সঙ্গে যানজট যেন এক অবিচ্ছেদ্য বাস্তবতা। প্রতিদিন লক্ষ লক্ষ মানুষ ট্রাফিক সিগন্যালের লাল আলোতে দাঁড়িয়ে সময়, জ্বালানি আর ধৈর্য হারান। কিন্তু এই চেনা দৃশ্যের বাইরে গিয়ে রাজস্থানের কোটা শহর দেখাল এক ভিন্ন পথ— ট্রাফিক সিগন্যাল ছাড়াই সচল শহর।
কোটা এখন ভারতের প্রথম “সিগন্যাল-ফ্রি সিটি” হিসেবে পরিচিত, যেখানে আধুনিক নগর পরিকল্পনা আর বুদ্ধিদীপ্ত অবকাঠামোর মাধ্যমে যান চলাচল করা হচ্ছে নিরবচ্ছিন্নভাবে। এই উদ্যোগ শুধু শহরের যানজট সমস্যার সমাধানই নয়, বরং গোটা দেশের নগর ব্যবস্থাপনায় এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে।
কোটা: পরিচিতির বাইরে এক নতুন পরিচয়
রাজস্থানের কোটা দীর্ঘদিন ধরেই শিক্ষানগরী হিসেবে পরিচিত। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা লক্ষ লক্ষ শিক্ষার্থী এখানে পড়াশোনা করতে আসে। ফলে শহরের রাস্তায় চাপ ছিল স্বাভাবিকভাবেই বেশি।
একসময় প্রতিটি বড় মোড়ে লম্বা লাইনে দাঁড়ানো যানবাহন, হর্নের শব্দ আর দুর্ঘটনার ঝুঁকি ছিল নিত্যদিনের চিত্র।
এই পরিস্থিতি থেকেই জন্ম নেয় এক সাহসী প্রশ্ন—
“ট্রাফিক সিগন্যাল ছাড়াই কি শহর চালানো সম্ভব?”
সিগন্যাল নয়, সমাধান হলো অবকাঠামো
কোটা শহরের এই যুগান্তকারী রূপান্তরের নেপথ্যে রয়েছে Urban Improvement Trust (UIT), Kota। তারা সিদ্ধান্ত নেয়— ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণের জন্য ইলেকট্রনিক সিগন্যালের ওপর নির্ভর না করে, শহরের রাস্তাগুলোই এমনভাবে গড়ে তোলা হবে যাতে যানবাহন থামতেই না হয়।
এই দর্শনকে সামনে রেখে নেওয়া হয় একাধিক বড় পদক্ষেপ।
১. ফ্লাইওভার ও আন্ডারপাস: থামা নয়, চলাই নিয়ম
কোটার গুরুত্বপূর্ণ ও ব্যস্ততম মোড়গুলোতে নির্মাণ করা হয় আধুনিক ফ্লাইওভার ও আন্ডারপাস।
🔹 একদিকে দ্রুতগামী যান উপরের পথ দিয়ে চলে যায়
🔹 অন্যদিকে স্থানীয় যানবাহন নিচের রাস্তা ব্যবহার করে
এর ফলে—
- সিগন্যালের প্রয়োজন পড়ে না
- মুখোমুখি সংঘর্ষ কমে
- যানবাহনের গতি বজায় থাকে
আজ কোটা শহরে এমন বহু মোড় আছে, যেখানে এক মুহূর্তের জন্যও গাড়িকে দাঁড়াতে হয় না।
২. রিং রোড: শহরের ভেতর নয়, শহরের চারপাশ দিয়ে যাত্রা
কোটার আরেকটি বড় সাফল্য হলো রিং রোড নেটওয়ার্ক।
এই রিং রোডগুলোর মূল উদ্দেশ্য—
- দূরপাল্লার যানবাহনকে শহরের ভেতরে ঢুকতে না দেওয়া
- শহরের কেন্দ্রকে হালকা রাখা
- শব্দ ও দূষণ কমানো
ফলে ট্রাক, বাস বা ভারী যান সহজেই শহরের চারপাশ ঘুরে গন্তব্যে পৌঁছে যায়, শহরের শিক্ষার্থী বা সাধারণ নাগরিকদের দৈনন্দিন যাত্রা ব্যাহত না করেই।
৩. আধুনিক রাউন্ডঅ্যাবাউট: লাল আলো নয়, বুদ্ধিদীপ্ত বাঁক
যেখানে ফ্লাইওভার বা আন্ডারপাস সম্ভব নয়, সেখানে ব্যবহার করা হয়েছে আধুনিক রাউন্ডঅ্যাবাউট (গোলচত্বর)।
এই রাউন্ডঅ্যাবাউটগুলো—
- বৈজ্ঞানিকভাবে ডিজাইন করা
- স্পষ্ট লেন মার্কিং ও দৃষ্টিসীমা নিশ্চিত
- ধীরগতিতে কিন্তু নিরবচ্ছিন্ন চলাচলের উপযোগী
ফলে সিগন্যালের লাল আলোয় থেমে থাকা নয়, বরং ধীরে ঘুরে সামনে এগিয়ে যাওয়াই এখানে নিয়ম।
৪. ডিজাইন-ফার্স্ট দর্শন: প্রযুক্তির আগে পরিকল্পনা
কোটার সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো—
সমস্যার সমাধান শুধু প্রযুক্তি নয়, সঠিক পরিকল্পনা।
UIT-এর পরিকল্পনাবিদরা শুরু থেকেই ট্রাফিক প্রবাহ, ভবিষ্যৎ জনসংখ্যা, যানবাহনের ধরন এবং দুর্ঘটনার পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে রাস্তা ডিজাইন করেছেন।
ফলাফল—
- কম সিগন্যাল
- কম মানবনির্ভর নিয়ন্ত্রণ
- বেশি স্বয়ংক্রিয় ও স্বাভাবিক ট্রাফিক প্রবাহ
এর প্রভাব কী হলো?
১. যাতায়াতের সময় কমেছে
আগে যেখানে একটি মোড় পার হতে ৫–১০ মিনিট লাগত, এখন তা নেমে এসেছে কয়েক সেকেন্ডে।
২. জ্বালানি সাশ্রয়
বারবার থামা-চলার প্রয়োজন না থাকায়—
- পেট্রোল ও ডিজেলের ব্যবহার কমেছে
- সাধারণ মানুষের খরচ কমেছে
৩. দূষণ ও কার্বন নিঃসরণ হ্রাস
কম স্টপেজ মানেই—
- কম ধোঁয়া
- পরিষ্কার বাতাস
- পরিবেশের উপর কম চাপ
🚑 ৪. দুর্ঘটনার হার কমেছে
সিগন্যাল ভাঙা, হঠাৎ ব্রেক বা মুখোমুখি সংঘর্ষ— সবই উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
ভারতের অন্য শহরগুলোর জন্য কী বার্তা?
দিল্লি, মুম্বাই, বেঙ্গালুরু, কলকাতা— প্রতিটি বড় শহরই আজ যানজটে জর্জরিত। কোটা দেখিয়ে দিল—
“একই পুরনো পদ্ধতিতে নয়, নতুন চিন্তায় সমাধান সম্ভব।”
কোটা মডেল প্রমাণ করেছে—
- স্মার্ট সিটি মানে শুধু স্মার্ট স্ক্রিন নয়
- স্মার্ট সিটি মানে স্মার্ট পরিকল্পনা
ভবিষ্যতের শহর কেমন হবে?
বিশেষজ্ঞদের মতে, আগামী দিনে শহরগুলো হবে—
- কম সিগন্যাল নির্ভর
- বেশি অবকাঠামো নির্ভর
- মানুষ ও পরিবেশবান্ধব
এই যাত্রায় কোটা থাকবে এক রোল মডেল হিসেবে।
উপসংহার
কোটা শহর শুধু ট্রাফিক সিগন্যাল সরায়নি—
সে সরিয়েছে অচল ভাবনাকে।
যেখানে অন্য শহর সিগন্যাল বাড়াচ্ছে, কোটা সেখানে রাস্তা ঠিক করেছে।
এই সাহসী পদক্ষেপ ভারতের নগর উন্নয়নের ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায় লিখেছে।
সিগন্যাল ছাড়া শহর— আজ আর কল্পনা নয়, কোটা তার জীবন্ত প্রমাণ।
আরও পড়ুন: বর্ধমান জব ফেয়ার ২০২৫: ১৬টি কোম্পানি থেকে ৪৯টি অফার লেটার, যুবসমাজের জন্য সাফল্যের বার্তা!






[…] […]